ফাইল ছবি
ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসেসে তার রাষ্ট্রসেবার জন্য অবশ্যই বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে ১৯৫৬-১৯৫৭ সালের দিকে একটা রহস্যময় প্লেন-ক্রাশে নিহত হন তিনি। বিশ্বব্যাপী তার অবদান বিবেচনায় নিউইয়র্কের বিখ্যাত রকফেলার ব্রাদার্স ট্রাস্ট ফান্ডরূপে একটা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে একটা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে। নিউইয়র্ক নগরীতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান প্রবর্তন করে ‘র্যামনম্যোগসেসে’ পুরস্কার। ফিলিপাইন সরকারের সহযোগিতায় এটি ‘নোবেল প্রাইজ অব এশিয়া’ খ্যাতি লাভ করে। রাষ্ট্রীয় সার্ভিসে সুবিশাল অবদান রাখা, পাবলিক সার্ভিস, কমিউনিটি লিডারশিপ, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সৃজনশীল কমিউনিকেশন আর্টস, শান্তি ও আন্তর্জাতিক ইমার্জেন্ট লিডারশিপ ইত্যাদি বিষয়ে অবদান রাখা বিশ্ব-ব্যক্তিত্বদেরকে প্রতিবছর পুরস্কৃত করার একটা মহতী উদ্যোগ পরিচালিত হয়ে আসছে সেই সময়কাল থেকে। ফিলিপাইনের রাজধানীর ম্যানিলা নগরীতে র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন (র্যামন ম্যাগসেসে সেন্টার) প্রতিষ্ঠা করেছে। ছয় দশক ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অবদানের স্বীকৃতিরূপে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ৩৫৩ জন ব্যক্তিত্বকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। প্রথম অ্যাওয়ার্ডটি চালু করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। ৩১ আগস্ট রাষ্ট্রনায়ক র্যামন ম্যাগসেসের জন্মবার্ষিকীতে এটি চালু হয়েছিল। এটি প্রদান করার কার্যক্রম পরিচালিত হয় র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন দ্বারা।
বাংলাদেশের প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সাংবাদিক-সম্পাদক মতিউর রহমান, এনজিও ব্যক্তিত্ব অ্যানজেলা গোমেজ ও তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ পরিবেশবাদী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ সম্মানিত হয়েছেন এই র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে। ভারতে ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। এটি বিশ্বব্যাপী একটা অত্যন্ত সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ড হিসেবে পরিগণিত।
এ মুহূর্তে যে বিষয়টি সুধীমহলে আলোচিত হচ্ছে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে তেমন একটি আন্তর্জাতিক মানের পুরস্কার প্রর্বতন করা যায় কী-না। বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার কর্মকান্ডের দ্বারা দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করে গেছেন। জিয়াউর রহমান শুধু বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নিজেকে নেতৃত্বের পর্যায়ে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এই যে, র্যামন ম্যাগসেসে যেমন রহস্যময় প্লেন ক্রাশে নিহত হন, জিয়াউর রহমান দুর্ভাগ্যক্রমে সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের চক্রান্তে চরম নিষ্ঠুরতায় নিহত হন মাত্র। রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ওই সময়কাল অবধি ইরান-ইরাক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-বন্ধের তৎপরতায় বিশাল অবদান রেখে যান। তিনিই এই দক্ষিণ-এশীয় অঞ্চলে বিশাল যৌথ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার লক্ষ্যে দক্ষিণ-এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গড়ে তোলার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি সার্ক ও অন্যসব বিশ্বনেতা পরে দিয়েছিলেন অকাতরে।
এসব কারণে র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ডের আদলে জিয়ার নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করি। এই পুরস্কারটি বছরে একজন রাষ্ট্রনায়ক বা বিখ্যাত রাজনীতিবিদকে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এটির পুরস্কার অর্থমূল্য হবে দুই কোটি টাকা সমমানের (বা মার্কিন ডলার সমমূল্যের)। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রতিবছর র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড বেশ কয়েকটি দেওয়া হয় এবং তার প্রতিটির অর্থমূল্য আরও কম (সম্ভবত বাংলাদেশি মুদ্রায় ষাট বা সত্তর লাখ টাকার সমান)। যেহেতু সারাবিশ্ব থেকে মানে প্রায় আড়াইশ রাষ্ট্র ও অঞ্চল (কাছাকাছি সংখ্যক) থেকে প্রতিযোগিতার জন্য এই-সংখ্যক ব্যক্তিত্বকে যাচাই-বাছাই তালিকায় আনা হবে। আর বাছাই ও মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি ট্রাস্ট-বডি (যার সদস্য-সংখ্যা হবে কমবেশি ১৫ জন এবং তারা হবেন স্বনামখ্যাত পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক প্রমুখ ব্যক্তিত্ব)। প্রতিবছর ট্রাস্টের চল্লিশ শতাংশ সদস্যকে অদল-বদল করা যেতে পারে একটা অ্যাওয়ার্ড ঘোষণার সাথে সাথে। আর প্রতিবছর জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে ঢাকায় অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে অন্তত বিশ্বসেরা তিনশ ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হবে অংশগ্রহণের জন্য। এটি সারাবিশ্বকে প্রতিবারই নাড়া দিবে।
এই তহবিল কীভাবে সংগৃহীত হবে? এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্র পঞ্চাশ কোটি টাকার একটা ট্রাস্ট ফান্ড করে এককালীন ডোনেশন (যা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে জমা থাকলে তা থেকে অন্তত দশ শতাংশ মুনাফায় পাঁচ কোটি টাকা মুনাফা আসবে) হিসেবে দিয়ে দিতে পারে। সেই অর্থে প্রতিবছরের পুরস্কারের দুই কোটি টাকা আর সমগ্র প্রশাসনিক ব্যয়ের (সারা দুনিয়া থেকে ব্যক্তিত্ব বাছাইয়ে, চূড়ান্ত মনোনয়নে প্রশাসনিক ব্যয় এবং প্রতিবছরের বিশাল মাপের অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হবে।) এরই মধ্যে একটা ‘রাষ্ট্রনায়ক-জিয়া স্মারক বক্তৃতা’ চালু করা যাবে।
যদি এই পঞ্চাশ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের অর্থ বিএনপি তার দলীয় তহবিল ও নেতাকর্মীদের অনুদান থেকে সংগ্রহ করে জমা দিতে চায়, সেজন্য মাত্র তিন মাস সময়কালই যথেষ্ট। জিয়া প্রতিষ্ঠিত দল এবং এর নেতাকর্মীরা নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং তাকে স্বনির্ভর করে তোলার যে যুগান্তকারী পথনির্দেশ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দিয়ে গেছেন, তাকে অমর করে রাখতে এমন একটি পুরস্কার প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।
লেখক: জাতীয় সংসদ সদস্য, যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি