হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬ ১৪:৪৫ পিএম
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক রাশিয়া সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; এটি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে। তিন দিনের এ সফর ঘিরে মস্কোর ইতিবাচক মূল্যায়ন এবং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পারমাণবিক জ্বালানি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মতো বিষয়ে অগ্রগতির ঘোষণা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একমুখী অবস্থানের পরিবর্তে ভারসাম্যভিত্তিক বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে, বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ এবং তাদের সঙ্গে কৌশলগতভাবে অবস্থান নেওয়া একটি অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক শক্তি সরকারকে ‘আমেরিকান প্রভাবাধীন’ বলে প্রচারণা চালাতে শুরু করে। এমনকি ‘দেশ বিক্রি হয়ে গেছে’ ধরনের আবেগনির্ভর রাজনৈতিক স্লোগানও সামনে আনা হয়। কিন্তু রাশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে সরকার কার্যত দেখাতে সক্ষম হয়েছে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই বর্তমান কৌশল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব এখন স্পষ্টভাবেই নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বলয়, অন্যদিকে রাশিয়া-চীনকেন্দ্রিক বিকল্প শক্তি কাঠামো এই দুই মেরুর মধ্যে অবস্থান করে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একপাক্ষিক অবস্থান নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সব ক্ষেত্রেই বহুমুখী অংশীদারত্ব এখন সময়ের দাবি।
ড. খলিলুর রহমানের সফরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর জোর। রুশ দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় দেশই স্বীকার করেছে যে, বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। কারণ বাংলাদেশের জন্য রাশিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক মিত্র নয়; এটি একটি বিশাল বাজার, জ্বালানি সহযোগী এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নতুন অর্থপ্রদান ব্যবস্থা ও বিকল্প আর্থিক চ্যানেল নিয়ে আলোচনা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া বর্তমানে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি বিকল্প লেনদেন কাঠামো ব্যবহার করে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে সক্ষম হয়, তাহলে তা দেশের রপ্তানি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতিরও একটি প্রতিফলন।
রাশিয়ার সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিশনের সঙ্গে এফটিএ করার আগ্রহও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন শুধু পশ্চিমা বাজার-নির্ভর থাকলে চলবে না। ইউরেশীয় অঞ্চল, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হতে পারে।
এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ প্রকাশ। এটি কেবল প্রতীকী কোনো কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের ইঙ্গিত। ব্রিকস এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট নয়; এটি পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টার অংশ। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এ ধরনের প্লাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ স্বাভাবিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় সম্ভবত প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতার আলোচনা। স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষিতে এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে দুই দেশের যৌথ কাজের আগ্রহ ভবিষ্যৎমুখী কূটনীতির একটি উদাহরণ। বাংলাদেশ এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুধু পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে বিকল্প প্রযুক্তিগত অংশীদার তৈরি করা একটি বাস্তবসম্মত নীতি।
পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর একটি। এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রতীক। রাশিয়ার সঙ্গে এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকা বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই সফর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে যে প্রচারণা তৈরি হয়েছিল সরকার নাকি কেবল আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে রাশিয়া সফর সেই ধারণাকে দুর্বল করেছে। বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সফল রাষ্ট্রগুলো কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোও এখন ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি মানেই রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি নয়। আবার রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করাও পশ্চিমবিরোধী অবস্থান নয়। বরং একটি পরিণত রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা। বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান ক্রমেই সেই বাস্তববাদী ধারার দিকে যাচ্ছে। তবে এই ভারসাম্যনীতি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া বৈরিতা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলের বিষয়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য পক্ষের আস্থাহীনতা সৃষ্টি না করা।
ড. খলিলুর রহমানের রাশিয়া সফর তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। এই সফর দেখিয়েছে, বাংলাদেশ এখন আর কেবল সাহায্য-নির্ভর বা প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি করছে না; বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সামনে রেখে বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চাইছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের জন্য ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই ঐতিহাসিক নীতিকে নতুন বাস্তবতায় আধুনিকভাবে প্রয়োগ করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। রাশিয়া সফর সেই পথচলারই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করছে।
লেখক: জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক