× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নতুন দরে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য লিটারপ্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত ৩ মে বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিদ্যুতের দাম অন্তত ২০ শতাংশ বাড়ানো রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো সংবেদনশীল পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। যার প্রভাব পড়বে সর্বসাধারণের ওপর। এছাড়া কৃষি, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়তো পড়ছেই। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর। বাসা ভাড়াসহ বেড়েছে ভোগ্যপণ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে শিল্পকারখানা, সেচ কার্যক্রম, কোল্ড স্টোরেজ ও উৎপাদন খাতের ব্যয়ও বেড়ে যাবে বা ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং ইরান ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার ইতোমধ্যে দুই দফায় বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের মূল্য সমন্বয় করেছে। সর্বশেষ ঘোষিত নতুন দর ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে কমানো প্রয়োজন ছিল বলে সাধারণ জনগণে অভিমত। কিন্তু তা না করে অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সর্বগ্রাসী প্রভাব ফেলে। এর ফলে বাসাবাড়ির নিত্যব্যবহার্য সেবা ও পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের বাজারে। এতে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং রপ্তানি পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ছোট কারখানা, দোকান এবং কুটিরশিল্পগুলো বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপে সংকটে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। 

আসা যাক মূল্যস্ফীতির বিষয়ে। ২০২৬ সালের মার্চে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ। আগের বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৩৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৮.২৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৯.৩০ শতাংশ। তবে গত বছরের মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে, খাদ্য-বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে এ বছরের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৯.০৯ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৯.০১ শতাংশ। তবে এই খাতে ২০২৫ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলক বেশি, ৯.৭০ শতাংশ। গ্রাম ও শহর উভয় অঞ্চলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। গ্রামীণ এলাকায় পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি মার্চে দাঁড়িয়েছে ৮.৭২ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারির ৯.২১ শতাংশ থেকে কম। তবে গত বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ মার্চ ২০২৫-এ এটি ছিল বেশি ৯.৪১ শতাংশ। 

গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৯.০৭ শতাংশ থেকে ৮.০২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৯.৩৪ শতাংশ থেকে ৯.৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের মার্চ মাসে গ্রামাঞ্চলে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৮.৮১ শতাংশ এবং ৯.৯৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলেও মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.০৭ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৮৭ শতাংশ থেকে কমে ৮.৭৮ শতাংশে নেমেছে, তবে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮.৫৭ শতাংশ থেকে ৮.৬২ শতাংশ হয়েছে। আগের বছরের জানুয়ারিতে শহরাঞ্চলে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৯.১৮ শতাংশ এবং ৯.৯৫ শতাংশ। ৫ এপ্রিল প্রকাশিত বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে স্বল্প আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের গড় মজুরি সামান্য বেড়ে ৮.০৯ শতাংশ হয়েছে- যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৮.০৬ শতাংশ। যদিও মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৩ শতাংশ থেকে ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে, তবুও শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় এখনও পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৫০ মাস ধরে প্রকৃত আয় হ্রাসের ধারা অব্যাহত রয়েছে।

ঘাটতির অজুহাতে বারবার দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৪০ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রয়েছে, যা কমানো গেলে ভর্তুকির চাপ অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। অতীতে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার বোঝা এখন সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে। জ্বালানি তেলে সরকার যে ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলে, তার পেছনের হিসাবটি বেশ চমকপ্রদ। বর্তমানে ১৪০ বা ১৪৫ টাকা লিটার দরে যে তেল বিক্রি হচ্ছে, তার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই হলো সরকারি ট্যাক্স বা কর। সরকার যদি এই ট্যাক্স পুরোপুরি তুলে নিত, তবে লিটারপ্রতি তেলের দাম নেমে আসত ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। তার মানে হলো, সরকার এক হাত দিয়ে ট্যাক্স নিচ্ছে, অন্য হাত দিয়ে সেটার কিছুটা ছাড় দিয়ে বলছে ‘ভর্তুকি’ দিচ্ছি। এর অবশ্য একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ আছে। আমাদের দেশে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর দেওয়ার হার অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক; মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ কর দেন। ফলে সরকারকে তার রাজস্ব আয়ের জন্য পরোক্ষ কর, যেমন ভ্যাট, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (এসডি) ও জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই রাজস্ব আয় বন্ধ হলে সরকারও চলবে না। তাই ট্যাক্স কমানো সরকারের পক্ষে কঠিন।

দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের বর্তমান রিফাইনারি বা শোধনাগার সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। শুধু ডিজেলের সম্পূর্ণ চাহিদা নিজেদের মেটাতে হলে দেশে আরও অন্তত চারটি রিফাইনারি প্রয়োজন। তবে এটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই, কারণ প্রয়োজনে বিশ্ববাজারের রিফাইনারি সক্ষমতা ব্যবহার করেই আমরা চাহিদা মেটাতে পারি। সরকার অবশ্য নতুন রিফাইনারি তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে, যা ইতিবাচক। যদি আমরা ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার সাথে তুলনা করি, তবে দেখব আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের দাম (লিটারপ্রতি প্রায় ১.১ বা ১.২ ডলার) তাদের কাছাকাছিই। তিন দেশের ক্রয়ক্ষমতাও কমবেশি কাছাকাছি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমাদের মানুষের আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের সম্মিলিত মূল্য ক্রয়ক্ষমতার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে (যদিও পরিশোধিত পেট্রোল-ডিজেলের দাম কিছুটা ভিন্ন হতে পারে)। বর্তমানে তেলে সরকার খুব বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে বলে মনে হয় না। তাই সরকারের কাছে আহ্বান থাকবে স্বচ্ছতার। তেল আমদানিতে প্রকৃত খরচ কত হচ্ছে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা হলো বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশে যেমন তেলের দাম বাড়ানো বা ‘সমন্বয়’ করা হয়, বিশ্ববাজারে দাম কমলে ঠিক একইভাবে দেশের বাজারেও তেলের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। একমুখী সমন্বয় কখনও টেকসই অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বর্তমান সরকার বলছে, ভর্তুকি কমাতেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় (১ ডলার সমান ১১৮ টাকা) বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। একই সময় শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের নামেই লুটপাট হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের দায় জনগণ নেবে কেন? তবে যাহোক, জ্বালানি তেল আর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগণের ওপর চাপ পড়বে আর সেই সাথে গোটা অর্থনীতির ওপরও।


লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা