ফাইল ছবি
বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যোগ দিয়েছেন গত শুক্রবার। তিনি পেশাদার কোনো কূটনীতিক নন। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ও লোকসভার সদস্য হিসেবে ড. মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে শেষ পর্যন্ত থিতু হয়েছেন বিজেপিতে। ৭৬ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিকের বাংলাদেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। অবশ্য এর আগে যারা বাংলাদেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তারাও সবাই ছিলেন অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ। তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি দেখেছেন কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আর দীনেশ ত্রিবেদী যেহেতু একজন রাজনীতিবিদ, তাই তিনি দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়ন ও ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা যায়।
দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে তার পা রেখেছেন একটু ভিন্ন কায়দায়। পূর্বসূরিদের মতো আকাশপথে না এসে তিনি এসেছেন স্থলপথে এবং বেনাপোল সীমান্তের চেকপোস্ট পার হয়েছেন পায়ে হেঁটে। তার এ ব্যতিক্রমী আগমনের তাৎপর্য কী তা নিয়ে ইতোমধ্যেই সচেতন মহলে আলোচনার জন্ম হয়েছে। এর দ্বারা তিনি যদি বোঝাতে চেয়ে থাকেন যে, মাটির সঙ্গেই তার সম্পর্ক এবং মাটির কাছাকাছি থেকেই দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সচেষ্ট থাকবেন, তাহলে তাকে বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাগত জানাবে। এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক জটিল সময়ে মি. ত্রিবেদী ভারতের প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। এ সময়ে তাকে এখানে নানামুখী সমস্যার সমাধান এবং দুই বন্ধু দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহু পুরনো। একসময় এই দুই দেশ একসঙ্গে ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল হিসেবে পরাধীন ছিল। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি ও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে দুই অঞ্চল পৃথক দুটি রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে। তা ছাড়া ঐতিহ্যগতভাবেও দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সাযুজ্য বিদ্যমান। ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দীর্ঘ স্থল সীমান্তের দ্বারা সম্পর্কিত। তা ছাড়া আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি ভারতীয় রাজ্যও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল সীমান্ত-সম্পর্কিত। ফলে এই দুই অসম প্রতিবেশীর কূটনৈতিক সম্পর্কের রয়েছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। বাংলাদেশ তাই নিকটপ্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাছ থেকে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ আশা করে। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার ও জনগণের সহমর্মিতা ও ঔদার্যপূর্ণ সহযোগিতা বাংলাদেশ সব সময় সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে। সবচেয়ে বড় কথা, ‘কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখতে বাংলাদেশ সচেষ্ট, তেমনি ভারতের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
তবে দুঃখজনক হলেও অস্বীকার করা যাবে না, সময়ে সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু আচরণ ও পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কের অবনতিতে অনুঘটকের কাজ করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার, তিস্তা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে না আসা, টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশিদের হত্যা এবং সর্বশেষ যুগ যুগ ধরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক আবহ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। দীনেশ ত্রিবেদী যেদিন বাংলাদেশে পদার্পণ করেছেন, সেদিনও একাধিক স্থানে পুশইন প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও জনগণ প্রতিহত করেছে। এমনকি পুশইনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ সব সময় সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণে বিশ্বাসী এবং এযাবৎকাল তাই করে এসেছে। কিন্তু বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে যতটা ইতিবাচক আচরণের প্রত্যাশা ছিল, ততটা পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি ভারত সরকারের দৃষ্টিকটু সমর্থন ও পক্ষপাতিত্ব এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে দেশটি সম্পর্কে বৈরী মনোভাবাপন্ন করে তুলেছে। বলা নিষ্প্রয়োজন, ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত দুটি নিকট প্রতিবেশী দেশের জন্য তা মোটেও সুখকর নয়।
অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মি. দীনেশ ত্রিবেদীর দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উষ্ণ হবে এবং বিদ্যমান সমস্যা নিরসন সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে সেজন্য তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের মনের ভাষা পাঠ করতে হবে এবং তার সরকারকে তা অবহিত করতে হবে। যাতে ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। আমরা আশা করি, ভারতের নয়া হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার দ্বারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে সক্ষম হবেন।