গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শীর্ষক এই বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট। লক্ষ্য দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। নতুন সরকার ও নতুন অর্থমন্ত্রীর এই প্রথম বাজেটে রয়েছে বিধ্বস্ত অর্থনীতি টেনে তোলার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ চাঙ্গা করার প্রচেষ্টা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার রোডম্যাপ, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পদক্ষেপ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় আকাশছোঁয়া প্রত্যয়। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কল্যাণের বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেট দেওয়া হয়েছে। একটি বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে গিয়ে আগামী দিনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।’
প্রতিবারই জাতীয় বাজেট পেশের পর নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা
হয়ে থাকে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কেউ একে উচ্চাভিলাষী, কেউ স্বপ্নবিলাসী, আবার কেউ গতানুগতিক বাজেট
বলে মন্তব্য করেছেন। প্রশ্ন রয়েছে, এত বড় বাজেটের জন্য অর্থ
কোথা থেকে আসবে? বিশেষ করে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রেখে বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন করা
হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কারণ, দেশে ব্যাংক
খাতের দুরবস্থায়। মূল্যস্ফীতি ১০ ছুঁইছুঁই। বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে। বৈশ্বিক
অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তো আছেই। তবে, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক কিংবা অর্থনীতিবিদদের
অনেকেই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তারা যে দিকগুলোর সমালোচনা করেছেন, সরকারের সেগুলো
পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে এবং সেই নিরিখে সংশোধনের সুযোগও আছে।
আমরা মনে করি, একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে ঘুরে দাঁড়ানোর
বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। তাই দেশের
মানুষ তাকিয়ে ছিলেন বাজেটের দিকে। সব পক্ষকে খুশি করতে করের ক্ষেত্রে বিপুল ছাড়ও
দিয়েছেন মন্ত্রী। এ কথা সত্য, চলমান বৈশ্বিক সংকটের বাইরে আমরাও নই। বিশেষ
করে, আর্থিক খাতের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে
আমাদের সামনে চোখ রাঙাচ্ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সন্তোষজনক নয়। এমন প্রেক্ষাপটে
ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির রাশ টানার চ্যালেঞ্জকে বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
দুর্ভাগ্যজনক সত্য, অতীতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নানা
সাফল্যের গল্প বলা হতো। বাস্তবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ নীরব অর্থনৈতিক
যুদ্ধে জীবনযাপন করেছে। বাজারে আগুন, চিকিৎসা ব্যয়ে লাগামহীন বৃদ্ধি, শিক্ষা
খরচের চাপ এবং সীমিত আয়ের বাস্তবতায় লাখো মধ্যবিত্ত পরিবার ধীরে ধীরে
নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্রতার ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে এবার স্বস্তির
কথা বলব, প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক কর ছাড়ের প্রস্তাব করা
হয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি,
ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ থেকে
কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্বস্তির কথা বলব,
স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ার বিষয়েও। তবে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির
পাশাপাশি বহুমুখী অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। মোট জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের
যেহেতু ব্যয়ের চাপ সইবার সক্ষমতা কম, সেহেতু সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবার পথ
আরও মসৃণ করা জরুরি।
বিশাল
এই ব্যয়ের বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বেশি নজর দিয়েছেন
অর্থমন্ত্রী। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বরাদ্দ ৩৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে
৬৯ হাজার কোটি টাকা করেন। স্বাস্থ্য খাতে অতীতে একলাফে এত বেশি বরাদ্দ বাড়ায়নি।
শিক্ষায় বরাদ্দ ৮৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন।
ফ্যামিলি-কৃষক কার্ডসহ অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির আওতা ব্যাপক বাড়িয়েছেন। খাল
খননসহ কৃষির খাত সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগের প্রস্তাব রেখেছেন।
কর
প্রস্তাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নানা সুবিধা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। দেশীয়
শিল্প বিকাশের ধারা অব্যাহত রাখতে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ শিল্পে
বিদ্যমান কর সুবিধা পাঁচ বছর অব্যাহত রাখা হয়েছে। জ্বালানির সংকট মোকাবিলায় বিকল্প
উৎস হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। পাঁচ বছরের জন্য কর
নির্ধারণের আগাম পরিকল্পনায় স্বস্তি পেয়েছেন করদাতারা। করব্যবস্থা সহজীকরণের
ঘোষণাও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমাতে
যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে নিঃসন্দেহে তা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে নানা
রকম সংরক্ষণমূলক নীতি গ্রহণ করেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যায়নি। নানা সময়ে অসাধু ও
স্বেচ্ছাচারী ব্যবসায়ীদের দফায় দফায় কারসাজির বহুমাত্রিক চিত্র সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে।
অতীতের এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে নির্মোহ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে না পারলে মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা
চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাজেটে আরও সুস্পষ্ট
দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের জন্য একক সেবা কার্যক্রম কার্যকর করা,
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টির ধারাবাহিকতা
নিশ্চিত করতে হবে।
আসলে বাজেট হচ্ছে অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। এটা জাতির রূপরেখাও বলা যায়। এই রূপরেখাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে পুনরায় শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। যে কারণে সরকার বিশাল বাস্তবমুখী, বিনিয়োগ-উৎসাহিতকারী এবং কর্মসংস্থানমুখী বাজেট দিয়েছেন। আমরা মনে করি, সরকার লক্ষ্য অর্জনে সফল হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হবে, যা হতে পারে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের সহায়ক।
সম্পাদকীয়