মাহমুদুল হক আনসারী
প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে
রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ছবি
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে প্রধান ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে কাজ করছে আন্তর্জাতিক তহবিলের ঘাটতি বা খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে ক্যাম্পের অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
বাংলাদেশে কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার এই বিশাল জনপদে প্রধান সংকটগুলোর মধ্যে রয়েছে, তহবিল ও খাদ্য সহায়তা হ্রাস : দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা ক্রমেই কমে আসছে। এর ফলে মাথাপিছু রেশন কমে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ঝুঁকিতে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি : ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার, মাদক চোরাচালান, অপহরণ ও খুনোখুনি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতায় সাধারণ রোহিঙ্গারা যেমন জিম্মি, তেমনি স্থানীয় বাংলাদেশিদেরও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সংঘাত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থমকে গেছে।
ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা কঠিন
হয়ে পড়েছে, ফলে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। পাশাপাশি স্থানীয় বনাঞ্চল ও পরিবেশের
ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা
(যেমন জাতিসংঘ) ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলো (যেমন ফিনল্যান্ড) মাঝে মাঝে জরুরি সহায়তা
প্রদান করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা
বাস্তবায়ন এখানে কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান, নোবেল
বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচক্ষণ কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি কিছু আশার বাণী শুনিয়ে বিদায়
নিয়েছেন। কিন্তু তার সফলতা বাংলাদেশের জনগণ দেখতে পায়নি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ১ লাখ
৮০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বাস্তবতা এখনও শুরু
হয়নি। তালিকাভুক্ত ১ লাখ ৮০ হাজারের বাইরে আরও ৮০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা পরীক্ষানিরীক্ষা
করার কথাও ছিল। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিজ দেশে স্বসম্মানে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের
কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি ছিল তখনও এখনও নেই।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে উখিয়া টেকনাফের
১২টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে ৩৩টি ক্যাম্পে ১৩ থেকে ১৪
লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে। তাদের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ
জোরেশোরে কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও এ পর্যন্ত কোনো আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যায়নি। তাদের
অবস্থানের কারণে স্থানীয় ৫ লাখ বাংলাদেশি প্রতিদিন নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে আন্তঃকোন্দল বাড়ছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রুপের সৃষ্টি।
সন্ত্রাস অপহরণ নারী শিশু পাচার অহরহ ঘটছে। জঙ্গি সম্পৃক্ততা মিলছে। আন্তর্জাতিক নানা
দেশের জঙ্গি গ্রুপের সাথে ক্যাম্পে থাকা সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যোগাযোগের তথ্য আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর হাতে আসছে। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য বড় রকমের হুমকি হিসেবে
তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে তারা অবস্থান করছে। এদেশের সরকার ও জনগণ মানবিক
কারণে তাদেরকে আশ্রয় দিলেও বর্তমানে এ অঞ্চলের জন্য তারা আতঙ্ক হিসেবে তৈরি হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামে নানাভাবে ঢুকে পড়ছে। বাংলাদেশের এন আইডি, জন্মনিবন্ধন বিভিন্ন কৌশল
করে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে। মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে অবৈধ পথে
পাসপোর্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করার কথা শোনা যায়। এগুলো ব্যবহার করে স্থল, নৌপথে বাংলাদেশের
বাইরে পাড়ি জমানোর জন্য চেষ্টা করছে। সমুদ্রপথে নারী শিশু পাচার করছে। একটি সিন্ডিকেট
শক্তভাবে তাদেরকে এসব পথে পাচার করছে। এ অঞ্চলের সমস্ত রকমের মাদকের পাচারের সাথে রোহিঙ্গারা
নানাভাবে সম্পৃক্ত।
তাদের কারণে মাদক, নারী শিশু পাচার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দিন
দিন তারা হিংস্র হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশি স্থানীয় নাগরিকগণ নানাভাবে দৈনন্দিন সমস্যার
সম্মুখীন হচ্ছে। এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী, মাদক ও অস্ত্রপাচারকারী গ্রুপের সাথে মিয়ানমার
এবং পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বিরোধী
চক্রান্তে রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী জড়িত থাকার যথেষ্ট আলামত পাওয়া যাচ্ছে। তারা
দেশের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এসব সন্ত্রাসীর
কতিপয় গোষ্ঠী মদদ দিচ্ছে বলেও শোনা যায়। এনজিও নামক অগণিত প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ে কাজ
করছে। দেশ-বিদেশ থেকে তারা তাদের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে আসছে। অনুদানের অর্থ
তাদেরকে দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ অনেকেই রাতারাতি
আঙুল ফুলে কলাগাছ। এ সবকিছু বাংলাদেশ-বিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে সচেতন জনগণ।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের নানা কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। অত্যন্ত
মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেয় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অঞ্চলে। সে দেশের
জনতা সরকার তাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালালে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। হাজার হাজার
রোহিঙ্গা নাগরিক নির্মমভাবে তাদের হাতে নিহত হয়। গুম করে অপহরণ করা হয়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে
দেওয়া হয়। তাদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়। এ দৃশ্য সারা পৃথিবী
অবলোকন করেছে। ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিছিলে মিছিলে বাংলাদেশের সীমান্তে প্রবেশ
করে। বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় দেয়। তাদের জন্য উদ্বাস্তু
ক্যাম্প তৈরি করা হয়। নারী-শিশু-বৃদ্ধ-বনিতা শিক্ষিত অশিক্ষিত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে
বাংলাদেশের টেকনাফ, কক্সবাজারে ক্যাম্প তৈরি করে তাদেরকে আশ্রয় দেওয়া হয়। তারা আশ্রয়
নেওয়ার পর সারা পৃথিবী বাংলাদেশ সরকারকে মানবিকতার এই আচরণের জন্য ধন্যবাদ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের পাশে আন্তর্জাতিক দেশ সংগঠন সংস্থা দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদেরকে বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক মহল সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখের
অধিক এ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করছে। তাদের কারণে সে অঞ্চলের মানুষের
দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়-পর্বত বিলীন হয়ে গেছে। রোহিঙ্গারা
তাদের ক্যাম্পে বসে বসে জাতীয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় খেয়ে দেয়ে বেঁচে
আছে।
একটি চক্র রোহিঙ্গাদের থেকে নারী ও শিশুদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন
অঞ্চলে পাচার করছে। ওঁৎ পেতে থাকা কতিপয় রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে।
কোনোভাবেই তাদেরকে তাদের ক্যাম্পে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তারা কোনো নির্দেশনা মানছে
না। তাদের জন্য কাজ করছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা। দেশি-বিদেশি নানা সাহায্য
সংস্থা তাদেরকে নিয়মিত সহায়তা দিচ্ছে। এরপরেও তাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন আইন না মানা,
আনুগত্য না করা। বিভিন্নভাবে তারা এদেশের শৃঙ্খলা মানছে না। সেটি জনগণ দেখতে পাচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল একটি বাণিজ্য বাংলাদেশে চলছে। বৈধ-অবৈধভাবে অনেক ধরনের
সংস্থা এখানে রোহিঙ্গাদেরকে সাইনবোর্ড বানিয়ে কাজ করছে। বাস্তবে রোহিঙ্গারা বেঁচে থাকলেও
তাদের বক্তব্য হলো আত্মমর্যাদাহীন একটা জীবন তারা পার করছে। অনেক রোহিঙ্গার বক্তব্যে
জানা যায়, তারা পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে তাদের নিজ বাড়িভিটায় চলে যেতে চায়।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আপ্রাণ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলেও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক
মহল রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য যেটি করা দরকার, যা করা দরকার তা এখনও কার্যকর
হচ্ছে না। ফলে তারা দিন দিন বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছে। কারও নিয়মনীতি তারা মানছে
না। আন্তঃকোন্দলে তারা বিভক্ত।
তারা নানা ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এতে এ অঞ্চলসহ বাংলাদেশের মানুষের
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এদেশের জনগণের প্রত্যাশা অবিলম্বে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে
এবং আরও যাদেরকে রাখতে হয় জাতীয় আন্তর্জাতিক ফোরাম তৈরি করে তাদের দেশে পূর্ণ নাগরিক
অধিকার প্রদান করার মাধ্যমে তাদের দেশে প্রত্যাবর্তন করা হোক। আশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জোরালোভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাবে এবং সফলতা দেখাবে।
প্রত্যাশা জনগণের।
মাহমুদুল হক আনসারী
চেয়ারম্যান : নিরাপদ বিশ্ব ফোরাম