সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
ঢাকা নগরী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানী ঢাকা দেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সকল নাগরিক সুবিধার কেন্দ্রবিন্দু।
একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহরও। বর্তমানে এই মেগাশহরটি নাগরিকের বসবাসের জন্য এক কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ নগরীতেও পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ কোটি ৬৬ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর ঢাকা। ঘনত্বের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বড় শহর। শহরটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ২৩ হাজার থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ জনের বাস। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধার কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসছে। যে কারণে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এখানকার প্রধান সমস্যা। পাশাপাশি যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক সুবিধার সংকট ঢাকাকে ক্রমশ বসবাসের ক্রমশ অযোগ্য করে তুলছে।
এমন
বাস্তবতায় শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম
আলমগীর স্বীকার করেছেন, অপরিকল্পিত
নগরায়ণ ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে রাজধানী ঢাকা এখন আর বাসযোগ্য নেই। এই হাঁসফাঁস
অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মাঝেমধ্যেই তারও ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকার ইচ্ছা
জাগে। অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা
নদীর পানি এতটাই দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত যে এর ধারেকাছে যাওয়া দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীগুলোকে
দূষণমুক্ত করতে কার্যকর ও পর্যাপ্ত প্রকল্প না থাকায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন।
পরিসংখ্যান
বলছে, গত ৩০ বছরে ঢাকায় গড় তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি বেড়েছে। এজন্য মূলত জলাধার
কমে যাওয়া ও সবুজের বিনাশ, কাচের বিল্ডিং এবং শিল্প-কারখানা, যানবাহনের ধোঁয়াও
অন্যতম দায়ী। গত এক দশক ধরে ঢাকায় জুন মাসে তাপপ্রবাহ হচ্ছে। জলবায়ুজনিত এই
প্রাকৃতিক পরিবর্তন দিন দিন বাড়ছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রায় পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। আগে
যেখানে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও যেসব স্থানে জলাবদ্ধতা হতো না; এখন সেখানে ৮০
মিলিমিটারেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। নদী গবেষকরা বলছেন, ঢাকার চারপাশে বর্ষা ও
শরৎকালের ৪ মাস নদীতে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ থাকে। পানিতে জীব ও অনুজীবকে
বাঁচতে হলে প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকতে হয়। সেখানে আষাঢ়-আশ্বিন ছাড়া
বাকি ৮ মাসই থাকে ৫ গ্রামের ওপর। অর্থাৎ এ সময় পানিতে কোনো জীব-অনুজীব বাস করতে
পারে না। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়; শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগেও এই অবস্থা।
ঢাকার
আরেক সমস্যা হলো ভয়াবহ যানজট। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার একটি বড় অংশ মানুষ রাস্তায় নষ্ট
করছে। এতে শুধু সময়ই অপচয় হয় না, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাও কমে যায়। অপরিকল্পিত
সড়কব্যবস্থা, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এ সংকটকে
আরও গভীর করেছে। বায়ুদূষণও ঢাকার জন্য একটি বড় হুমকি। ইটভাটা, নির্মাণকাজ, পুরনো
যানবাহন এবং শিল্প-কারখানার কারণে বাতাসের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দূষিত বায়ুর ফলে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই
সঙ্গে শব্দদূষণ নগরবাসীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নগর পরিকল্পনার দুর্বলতাও ঢাকার সংকটের বিশেষ কারণ। খাল, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান
দখল হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ
এবং সবুজ আবহের সংকোচন নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। শিশুদের খেলাধুলা কিংবা
নাগরিকদের বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান নেই। জনসংখ্যার অতিরিক্ত
চাপ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও
উন্নত সেবার আশায় মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। ফলে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, বিদ্যুৎ
এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আমরা
মনে করি, এ সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। এর জন্য ঢাকার বাইরে শিল্প, শিক্ষা ও
প্রশাসনিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে
কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে। আধুনিক ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা
গড়ে তুলতে হবে। খাল ও জলাশয় উদ্ধার, বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ এলাকা সম্প্রসারণের
মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কঠোর নগর পরিকল্পনা ও আইন বাস্তবায়নের
মাধ্যমে অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। সবার আগে ঢাকার চারপাশের
নদীগুলোর প্রাণ ফিরাতে হবে। শহরের মধ্যে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো উদ্ধার করতে
হবে। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন নির্বিচার দখল ও দূষণে ঢাকার অর্ধশতাধিক খালের অধিকাংশই
আজ মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে।
রাজধানী
ঢাকা বাংলাদেশের হৃদয়। এই শহরকে বাসযোগ্য রাখা সরকারের একক দায়িত্ব নয়, নাগরিকদেরও
সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, পরিকল্পিত উন্নয়ন, কার্যকর প্রশাসন এবং
দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে ঢাকাকে আবার একটি বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও
আধুনিক নগরীতে পরিণত করা সম্ভব। অন্যথায় রাজধানীর সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ
নেবে এবং যার প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়তে পারে।