সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে
কর আদায়ে ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপে তীব্র অর্থসংকটে রয়েছে সরকার।
বলা যায়, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে সরকারের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে প্রত্যাশিত হারে কর আদায় বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি, ঋণ-নির্ভরতা এবং আর্থিক চাপ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এই চাপ সরকারের জন্য শুধু আর্থিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়।
বলা
বাহুল্য, প্রতি অর্থবছরই বাজেট ঘোষণার সময় সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবারই নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গে প্রকৃত আদায়ের ব্যবধান বাড়তে
থাকে। ফলে সেই ঘাটতি পূরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে পড়তে হয় বাড়তি চাপের মুখে। এমনই
এক চিত্র উঠে এসেছে গতকালের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে। এমন পরিস্থিতির
মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য
নির্ধারণ করেছে সরকার, যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। উদ্দেশ্য
হলো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো।
উল্লেখ্য,
গত অর্থবছরে এই হার নেমে দাঁড়িয়ে ছিল ৬.৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশের আকার ও অর্থনৈতিক
সম্ভাবনার তুলনায় খুবই কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে
প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা শোনা যায়।
এটা
মানতেই হবে, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে একটা অসামজ্ঞস্য
বিদ্যমান। অর্থাৎ প্রতি বছর লক্ষ্য বাড়লেও সেই লক্ষ্য অর্জনের হার আশানুরূপ নয়।
ফলে রাজস্ব ঘাটতি এখন সাময়িক কোনো সমস্যা নয়, কাঠামোগত একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত
হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের
ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ভোক্তাদের এই ব্যয় সংকোচনের কারণে বাজারে বিক্রি কমেছে, যার
সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারের ভ্যাট আদায়ে। একই সঙ্গে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে
যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। এতে আয়কর ও আমদানি
শুল্ক আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। কার্যত এসব কারণে ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম
খাচ্ছে বর্তমান সরকারও।
এ
কথা সত্য, দেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস কর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে
কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। আমাদের দেশে করদাতার সংখ্যা
সীমিত, কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর প্রবণতা ব্যাপক, আর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারও
কর আদায়ে বড় বাধা হয়ে আছে। ফলে অর্থনীতির আকার বাড়লেও রাজস্ব আহরণের গতি সেই
অনুপাতে বাড়ছে না। কিন্তু সরকারের ব্যয়ের পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। উন্নয়ন
প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা,
ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধÑ সব মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ বেড়েই চলেছে। বৈশ্বিক
অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে
অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে
ব্যবধান আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে ঘাটতি পূরণের জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক
ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণ ভবিষ্যতের জন্য নতুন চাপ
সৃষ্টি করে। ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের
জন্য অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত
ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা
অবশ্য সমস্যার মূল কারণ হিসেবে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাকেই দেখছেন নাÑ তারা বলছেন,
লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তব
অবস্থা, ব্যবসায়িক পরিবেশ কিংবা প্রবৃদ্ধির ধারা বিবেচনায় না নিয়ে উচ্চাভিলাষী
লক্ষ্য নির্ধারণের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। আমরা মনে করি, কর আদায়ে গতি
ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই করব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে,
কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সেবা
সম্প্রসারণ করতে হবে। করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করার
পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি এবং বৃহৎ
অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে করের আওতায় আনতে হবে।
আসলে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা। অপ্রয়োজনীয় ও কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীল ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি করলে সরকারের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। কর আদায়ে স্থবিরতা ও ব্যয়ের চাপের এই দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।