× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সুপার এল নিনো এবং বাংলাদেশ

আল শাহারিয়া

প্রকাশ : ২২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ২২ ঘণ্টা আগে

সুপার এল নিনো এবং বাংলাদেশ

বিশ্ব জলবায়ু ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো শুরু হওয়ার ৮২ শতাংশ এবং ২০২৬ এবং ২০২৭ সালের শীতকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকার ৯৬ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। এতে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিবর্তন বৈশ্বিক আবহাওয়া, কৃষি এবং অর্থনীতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য আসন্ন এই প্রাকৃতিক চক্রটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি পর্যায়বৃত্ত অবস্থা, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি সাধারণ কোনো এল নিনো হবে না। এটি একটি সুপার এল নিনো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পেলে তাকে সুপার এল নিনো বলা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার এখনই এর সর্বোচ্চ তীব্রতা নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত নয়, তবে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, নভেম্বর মাসের মধ্যে সমুদ্রের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একাধিক জলবায়ু মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এবারের ওশেনিক নিনো ইনডেক্স (ONI) তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করতে পারে, যা ইতিহাসে কেবল ১৮৭৮ সালের জানুয়ারিতে একবারই ঘটেছিল। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের এই এল নিনো সম্ভাব্যভাবে গত দেড়শ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাতে পারে। সুপার এল নিনো ইনডেক্স (SEI) মডেল অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই ধরনের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র হচ্ছে।

সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরামের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আসন্ন এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে যে বৃষ্টিপাত হয়, তা এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম হতে পারে। বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে দিনের সর্বোচ্চ এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা উভয়ই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পঁচাত্তর থেকে নব্বই শতাংশই এই মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টিপাত কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, নদী ও জলাশয়গুলো শুকিয়ে আসবে এবং কৃষিকাজে সেচের পানির তীব্র সংকট তৈরি হবে। পাশাপাশি তীব্র দাবদাহের কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যার জন্য এখন থেকেই হিট হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান বা তাপ স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সুপার এল নিনোর প্রভাব হতে পারে ধ্বংসাত্মক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমনিতেই বাংলাদেশ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বৃষ্টিপাত কমে গেলে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে দেশে দীর্ঘমেয়াদি খরা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৃষ্টিপাতের অভাবে নদীর মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাবে। এর ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি খুব সহজেই দেশের ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে।উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিগুলো লবণাক্ততার কারণে উর্বরতা হারাবে এবং সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার দেখা দেবে। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে। সুপার এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট খরা মাটি ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যকার আর্দ্রতার স্বাভাবিক আদান-প্রদানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। মাটি তার আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি শুষ্কতার জন্ম দেয়। সরকার, মানবিক সংস্থা, পানি ব্যবস্থাপক এবং কৃষকদের এখন থেকেই এই ভয়াবহ ঝুঁকিগুলো আগে থেকে অনুমান করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সুপার এল নিনো শুধু সাময়িক কোনো আবহাওয়ার বিপর্যয় নয় বরং বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থায় আকস্মিক এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ক্লাইমেট রেজিম শিফট বলা হয়। অর্থাৎ, এল নিনো শেষ হয়ে যাওয়ার পরও জলবায়ু তার আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় না, বরং একটি নতুন এবং আরও চরম মাত্রায় স্থায়ী রূপ নেয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের বিপুল তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা, ভূপৃষ্ঠের বায়ুর তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং মাটির আর্দ্রতা হারানোর এই ধ্বংসাত্মক চক্র দশকের পর দশক ধরে চলতে পারে। এর মানে হলো, আমরা যদি মনে করি এল নিনোর প্রভাব এক বছর পরই কেটে যাবে, তবে তা হবে আমাদের একটি বিশাল ভুল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি প্রশমনের ক্ষেত্রে আমাদের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অতীত ইতিহাসের গড়ের ওপর নির্ভর করে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। জলবায়ুর এই স্থায়ী পরিবর্তনগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। পূর্বাভাস পাওয়ার পর শুধু ত্রাণ বিতরণ বা সাময়িক জরুরি সাড়া প্রদানের প্রস্তুতি নিলে চলবে না। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি এবং কাঠামোগত সুরক্ষার দিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। কৃষকদের খরা সহনশীল এবং লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত চাষে অভ্যস্ত করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বড় আকারের প্রকল্প হাতে নিতে হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উপকূলীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কৃষি বিপর্যয়ের সময় তারা টিকে থাকতে পারে। দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতিই হলো আমাদের প্রধান হাতিয়ার এবং রক্ষাকবচ।

২০২৬ সালের আসন্ন সুপার এল নিনো আমাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলো আমাদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে। এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো এই পূর্বাভাসকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত কার্যকরী প্রস্তুতি গ্রহণ করা। নীতি নির্ধারক, গবেষক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী এবং স্থানীয় জনগণকে একসাথে কাজ করতে হবে। জলবায়ুর এই চরম রূপকে পুরোপুরি ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের নেই, তবে সঠিক অভিযোজন কৌশল এবং সুপরিকল্পিত আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে আমরা এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো অবশ্যই অনেকখানি কমিয়ে আনতে পারি।

 

আল শাহারিয়া

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা