× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মন্তব্য প্রতিবেদন

পদোন্নতি নয়, প্রতিবাদের অবসর: সিআইডি প্রধানের সিদ্ধান্ত কি পুলিশের ভেতরের সংকটের বার্তা?

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৮ ঘণ্টা আগে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আলী আকবর খানের স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন প্রশাসনিক পরিসরের একটি সাধারণ ঘটনা নয়। বরং এটি এমন এক সিদ্ধান্ত, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, পদোন্নতি প্রক্রিয়া এবং পেশাগত মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত ১ জুন তিনি সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পান। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে, ৪ জুন ঘোষিত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) পদে পদোন্নতির তালিকায় নিজের নাম না দেখে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, এটি কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত হতাশার গল্প নয়; বরং অনেকের কাছে এটি একটি নীরব প্রতিবাদ।

আলী আকবর খানের আবেদনপত্রের ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রায় তিন দশকের চাকরিজীবনে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হওয়ার অভিযোগও তুলেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে তিনি কার্যত কর্মজীবনের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ২০২২ সালে চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০২৪ সালে তিনি আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন। এমন একজন কর্মকর্তা, যিনি এত প্রতিকূলতার পরও পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন, তার পদোন্নতি না পাওয়া নিঃসন্দেহে তাকে হতাশ করেছে।

প্রশ্ন হলো, এই হতাশা কি কেবল ব্যক্তিগত? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো বাস্তবতা রয়েছে?

পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতি সব সময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনিক বিবেচনা—সবকিছুর সমন্বয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু যখন কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সম্প্রতি কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, এমনকি সরকারি মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে অন্য কোনো বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

আলী আকবর খানের ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। কারণ, তিনি চাকরি হারিয়ে নয়, বরং চাকরিতে বহাল থেকেও অবসরের পথ বেছে নিয়েছেন। অনেকেই এটিকে নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পদোন্নতি না পাওয়ার পরও পদে বহাল থেকে সুবিধা ভোগ করার পরিবর্তে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। পদোন্নতি না পাওয়াই কি অবসরের যথেষ্ট কারণ? রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার কাছে ব্যক্তিগত হতাশার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ কি বড় হওয়া উচিত নয়? এই প্রশ্নও উঠছে।

আলী আকবর খানের অতীত ক্যারিয়ারও বিতর্কমুক্ত নয়। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে দায়িত্ব পালনকালে এক জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছিল। সে সময় ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। ফলে তাকে এককভাবে নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে তার পুরো কর্মজীবনকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তারপরও বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু অন্য জায়গায়। সেটি হলো—পুলিশ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ডটা স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ?

যে কোনো বাহিনীতে মনোবল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন তার দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, তাহলে সেটি শুধু তার ব্যক্তিগত হতাশা নয়; বরং পুরো বাহিনীর মনোবলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন একই ধরনের অভিযোগ একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে আসে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

পুলিশ বাহিনী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ তদন্ত এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের ওপর ন্যস্ত। এই বাহিনীর ভেতরে যদি পদোন্নতি, পদায়ন বা অবসর নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক দক্ষতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে স্বচ্ছতার বার্তা দেওয়া। পদোন্নতি বা অবসরের সিদ্ধান্ত কোন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকলে বিতর্ক অনেকটাই কমে আসে। অন্যদিকে নীরবতা নানা ধরনের গুঞ্জন এবং জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আলী আকবর খানের অবসর আবেদন এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তার এই পদক্ষেপ একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

তার আবেদন গৃহীত হোক বা না হোক, ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের মূল্যায়ন কীভাবে করা হচ্ছে? এবং সেই মূল্যায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কতটা আস্থা রাখতে পারছেন?

আলী আকবর খানের অবসরের আবেদন হয়তো একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো প্রশাসনিক পরিসরে। তাই এই ঘটনাকে শুধু একটি পদোন্নতি বঞ্চনার কাহিনি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মনস্তত্ত্ব, আস্থা এবং পেশাগত মূল্যায়নের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা