× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মহানন্দার অপমৃত্যু রোধ জরুরি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে

মহানন্দার অপমৃত্যু রোধ জরুরি

আমাদের সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। নদীর সঙ্গে জড়িত আমাদের বিকাশমান জীবনধারার অস্তিত্ব।

নদীকে কেন্দ্র করেই একসময় গড়ে উঠেছিল এদেশের প্রাচীন নগর, বন্দর ও জনপদ। বিকশিত হয়েছিল কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি। সহজ করে বললে, এই নদী ছিল কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র। নদীমেখলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি ‘মহানন্দা’। কিন্তু পানিস্বল্পতা, নাব্যতা সংকট এবং উজানে প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন বাঁধ ও ব্যারাজের কারণে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই প্রাণবন্ত নদীটি। হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা মহানন্দা এখন বর্ষা ছাড়া সারা বছরই কার্যত মরা খাল। দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণসহ দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও নদীঘাতি কারণগুলোর অন্যতম। ফলে সংকুচিত হচ্ছে এর প্রবাহপথ, হারিয়ে যাচ্ছে জলজ প্রাণ ও নদী-নির্ভর বাস্তুতন্ত্র। এ পরিস্থিতি শুধু একটি নদীর সংকট নয়Ñ এটি ওই অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনজীবনের জন্যও বড় ধরনের অশনিসংকেত।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারের বুক চিরে বয়ে চলছে মহানন্দা। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার মহালদিরাম পাহাড়ের ‘পাগলঝোরা’ জলপ্রপাত থেকে মহানন্দার উৎপত্তি। পাহাড়ি এলাকায় এটি ‘মহানদী’ নামেও পরিচিত। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এঁকেবেঁকে নদীটি শিলিগুড়িতে সমতল ভূমিতে প্রবেশ করে। এর ভৌগোলিক গতিপথ দুটি দেশের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত এলাকা। এ নদীই তার প্রবাহে সুজলা-সুফলা, সমৃদ্ধিশালী করে তুলেছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমিকে। স্বাভাবিকভাবেই এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিবর্তন এই নদীটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মানচিত্রে এই নদীটিকে দু’বার দেখা যায়Ñ একবার উত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, আর দ্বিতীয়বার উত্তর-পশ্চিমের সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ‘বেলাসন’ নামক একটি পাহাড়ি জলধারাকে সঙ্গে নিয়ে ফুলবাড়ী অতিক্রম করে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে প্রথমবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে মহানন্দা।

মহানন্দা নদী যৌবন হারিয়ে এখন জীর্ণপ্রায়, শীর্ণকায়। বছরের অধিকাংশ সময় নদীজুড়ে পানির স্বল্পতার কারণে বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নাব্যতা হারানোর ফলে নদী আর আগের মতো বর্ষার পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে দু-কূলপ্লাবী প্লাবনে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর আরেকটি বড় সমস্যা হলো দূষণ ও দখল। নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা, বর্জ্য ফেলা এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর স্বয়ংক্রিয় পুনরুদ্ধার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মহানন্দার জীববৈচিত্র্যের দ্রুত অবক্ষয়। একসময় নদীতে নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ, কচ্ছপ, জলজ উদ্ভিদ ও পাখির বিচরণ ছিল। বর্তমানে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে কিংবা তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে শুধু জলজ প্রাণী নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীলতার ওপর।

একসময় এই নদীর বুক থেকে প্রচুর সিলিকা বালু ও নুড়ি পাথর উত্তোলনের মহোৎসব চলত, যা ছিল স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। হিমালয় থেকে নেমে আসা স্রোত যে নুড়ি পাথর ও বালু বয়ে আনত, তা সমতলের নদীগর্ভকে উঁচু করে তুলত। এলাকার একটি বড় জনগোষ্ঠী এই পাথর উত্তোলন, বাছাই ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বহু দুস্থ, বিধবা ও স্বামীপরিত্যক্তা নারী এই পাথর ও বালু সংগ্রহের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নদীতে পানি না থাকায় আজ সেই পেশা বিলুপ্তপ্রায়। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী ভারত কৃত্রিমভাবে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীটি আজ তার নাব্যতা ও জীববৈচিত্র্য হারাতে বসেছে। এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাবে হুমকির মুখে পড়েছে অববাহিকার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। আমরা মনে করি, উজানের দেশের এমন একতরফা উদ্যোগ আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নৈতিকতার পরিপন্থী। মহানন্দার এই করুণ দশা আমাদের পরিবেশগত সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিন্ন নদী সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে আরও একবার জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশেষ করে, বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ রোধে গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির পাশাপাশি মহানন্দা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

তারেক রহমানের সরকার খাল-বিল-নদী-নালা খনন, পুনর্খনন ও নাব্যতা রক্ষার কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা চাই, মহানন্দাকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। সময়ক্ষেপণ না করে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর তীর সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে উজান ও ভাটির পানিব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু একের পর এক নদী যদি প্রাণহীন হয়ে পড়ে, তবে সেই পরিচয় এবং সেই সঙ্গে আমাদের অস্তিত্ব একসময় প্রশ্নের মুখে পড়বে। মহানন্দা নদীর বর্তমান সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কসংকেত। এই নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলধারা রক্ষা করাই নয়Ñ একটি অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারাকে সুরক্ষিত করা। তাই মহানন্দা বাঁচাতে আর দেরি নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ।


সম্পাদকীয় 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা