সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে
ইতিহাস কদাচিৎ কোনো জাতিকে একই সঙ্গে সুযোগ, বৈধতা এবং দায়িত্ব দেয়।
যখন দেয়, তখন তা কেবল একটি দেশের নয়, পুরো সভ্যতার পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই বিরল ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু এই ঘটনাটিকে কেবল ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি গভীরতর বাস্তবতার প্রতিফলন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি আত্মজিজ্ঞাসার আয়না, যেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বহীনতার বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বাস্তবতা।
প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসভূমি দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর
তারুণ্য, জনবহুল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল। ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলপথ, মধ্যপ্রাচ্যের
জ্বালানি করিডর, পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজার এবং আফ্রিকার সঙ্গে কৌশলগত সংযোগ এই অতুলনীয়
ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা। কিন্তু
বাস্তবতা কেবল ভিন্ন নয়, প্রায় বিপরীত।
দক্ষিণ এশিয়া
আজও একটি কার্যকর, সংহত ও প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে
পারেনি। এর মূলে রয়েছে দুটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতÑ রাজনৈতিক বিভক্তি এবং নেতৃত্বের সংকট।
১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় স্বপ্ন ছিল, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সেই ঐতিহাসিক
ভূমিকা পালন করবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ান সফলভাবে পালন করেছে। চার দশক পর
সেই স্বপ্ন কেবল ধূলিসাৎ নয়, প্রায় উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালের পর একটিও
শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত
অকার্যকর করে রেখেছে। দুটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শত্রুতা ২০০ কোটি মানুষের
ভাগ্যকে নির্ধারণ করছে, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এই অঞ্চলে আর কী হতে পারে? যে অঞ্চলটি
সম্মিলিতভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারত, সেটি আজও বিচ্ছিন্ন
জাতীয় স্বার্থের সংকীর্ণ জালে আবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান বা আফ্রিকান ইউনিয়ন
যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়া এখনও একটি
সম্মিলিত শক্তি হয়ে উঠতে পারে নি।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল
বিশ্বব্যবস্থায় এই ব্যর্থতার মূল্য আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং অনেক বিপজ্জনক। কোভিড-১৯
মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন
কৌশলগত প্রতিযোগিতা মিলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করছে, যা বিগত সাত
দশকে দেখা যায়নি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসন ধরে রাখতে হিমশিম
খাচ্ছে, অন্যদিকে চীন নতুন শক্তির কেন্দ্র হিসেবে আক্রমণাত্মকভাবে আবির্ভূত হচ্ছে।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে বেড়েছে।
কিন্তু সেই গুরুত্বকে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা এই অঞ্চলের নেই।
ভারত নিঃসন্দেহে
এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি এবং জি-২০, ব্রিকস ও কোয়াডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্লাটফর্মে
ক্রমেই সক্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। কিন্তু ভারতের একক উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত
উত্থানে রূপ নেয়নি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা আঞ্চলিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করেছে। নয়াদিল্লি
ক্রমেই আঞ্চলিক কাঠামোর বদলে বৈশ্বিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
ফলে তৈরি হয়েছে এমন এক গভীর নেতৃত্ব শূন্যতা, যা পূরণ করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান বা
উদ্যোগ এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশের ইউএনজিএ
সভাপতিত্ব সেই শূন্যতা পূরণ করার জাদুর কাঠি নয়। কিন্তু এটি সেই শূন্যতাকে বৈশ্বিক
মঞ্চে দৃশ্যমান ও আলোচনাযোগ্য করে তুলতে পারে। আর সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পদ নির্বাহী ক্ষমতার পদ নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণে,
বহুপক্ষীয় সংলাপের কাঠামো তৈরিতে এবং বৈশ্বিক মনোযোগকে নির্দিষ্ট সংকটের দিকে পরিচালিত
করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
ঋণ পুনর্গঠন,
জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য আর্থিক কাঠামোর
প্রশ্নে বাংলাদেশ একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ফলপ্রসূ বৈশ্বিক আলোচনার পরিবেশ
তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের
নিজের জলবায়ু ঝুঁকি এবং মালদ্বীপের অস্তিত্বের সংকট এই সবকিছু একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক
কাঠামোর কাঠামোগত অসমতার প্রতিফলন। সেই বাস্তবতাকে বৈশ্বিক মঞ্চে জোরালোভাবে তুলে ধরার
এই সুযোগ বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সামনে
সবচেয়ে জরুরি, মানবিক এবং জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় ১১ লাখ
রোহিঙ্গা এখনও কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক
সহানুভূতি ধীরে ধীরে কমে আসছে, দাতাদের আগ্রহ ও অর্থায়ন হ্রাস পাচ্ছে এবং মিয়ানমারে
নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনও সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আন্তর্জাতিক
উদাসীনতার এই ক্রমবর্ধমান ঢেউয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি
হিসেবে বাংলাদেশ এই সংকটকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবে কিনা তা
এক বিরাট প্রশ্ন। যদিও এটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করবে না, তবে বিশ্ব বিবেককে নাড়া
দিতে পারে। মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিগুলোর সামনে নতুন করে রাজনৈতিক
ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ রচনায়
সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
ভেতরের ঘর না
সামলালে বাইরে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। তবে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে
কেবল বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ নয়, রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতার এক কঠিন ও অস্বস্তিকর
প্রশ্নও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক
সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্ক এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অত্যন্ত
শিক্ষণীয়। তার মনোনয়ন ও নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রদত্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়ে
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তীতে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে
পাঠানো হয়েছে এবং সহকারী মহাপরিচালক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনা একটি
বৃহত্তর ও অপ্রিয় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে মনোনয়নের ক্ষেত্রে
যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে, কেবল একটি দেশ নয়, পুরো অঞ্চলের
বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।
বৈশ্বিক নেতৃত্ব
শুধু পদ পাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তা প্রতিষ্ঠিত হয় কর্মদক্ষতায়, নীতিতে
এবং সর্বোপরি আস্থায়। বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বার্তা দৃঢ়ভাবে
প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে, দেশটি মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং নিরঙ্কুশ জবাবদিহিতার ভিত্তিতে
বৈশ্বিক নেতৃত্বকে সমর্থন করে, রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সংযোগের ভিত্তিতে নয়।
পরাশক্তিগুলোর
মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও বাংলাদেশকে এখন পরিপক্ব, সাহসী ও দূরদর্শী কূটনীতির
পরিচয় দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরস্পরবিরোধী প্রত্যাশার
মধ্যে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ এই নীতির প্রকৃত অনুশীলন এক্ষেত্রে
সফলতার চাবিকাঠি হতে পারে। বিশেষ করে গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রশ্নে বাংলাদেশের
অবস্থান সারা বিশ্ব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক
আইনের পক্ষে দৃঢ়, নির্ভীক ও নীতিগত অবস্থান গ্রহণই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কূটনৈতিক
মর্যাদাকে টেকসই উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এই মুহূর্তটি
শুধু বাংলাদেশের নয় এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন,
বাণিজ্য, সমুদ্র অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আঞ্চলিক
সমন্বয় এখন আর কোনো কূটনৈতিক বিলাসিতা নয়Ñ এটি অপরিহার্য। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব
কি পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ চিরকালের জন্য নির্ধারণ করে দেবে, নাকি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা,
নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো সেই দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে নতুন ধরনের, আরও
কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।
কিন্তু বাংলাদেশের ইউএনজিএ সভাপতিত্ব সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা অন্তত খুলে
দিয়েছে।
সহিদুল আলম স্বপন
সুইজারল্যান্ডপ্রবাসী কলাম লেখক