জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ। এ পদে বাংলাদেশ মনোনীত করেছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে।
নির্বাচনে বাংলাদেশ পেয়েছে ৯৯ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিয়াস। তিনি পেয়েছেন ৯১টি ভোট। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ নির্বাচনে ভোট দিয়ে থাকে। নবনির্বাচিত সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান আগামী এক বছর এ পদে বহাল থাকবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ফেসবুক পোস্টে ড. খলিলুর রহমানকে এ বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, এ অর্জন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, ড. খলিল গর্বের সঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বহুপাক্ষিক ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ
পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের বিজয় একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা। স্মরণযোগ্য, ১৯৮৬ সালে
বাংলাদেশ একবার এ পদে জয়লাভ করেছিল। সেবার বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। সময়ের হিসাবে চল্লিশ বছর পরে আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার
শীর্ষ পদে বাংলাদেশের অধিষ্ঠান ঘটল। এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যক্তির অধিষ্ঠানের চেয়ে
রাষ্ট্রের ভূমিকাই বেশি আলোচিত হয়ে থাকে। জাতিসংঘের মতো বিশ্বসংস্থার সাধারণ পরিষদের
সভাপতির পদটি নির্বাহী ক্ষমতার দিক দিয়ে যদিও খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে আলংকারিক পদ
হিসেবে অবশ্যই তা সম্মানের। তা ছাড়া সভাপতিকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন,
বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক পরিচালনা এবং সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে
হয়। প্রতিটি বার্ষিক সাধারণ অধিবেশন আহ্বান, সভাপতিত্ব ও সমাপ্তি ঘোষণা করাও তার দায়িত্ব।
সুষ্ঠুভাবে সভা পরিচালনা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিতর্কের বিষয়ে কার্যপ্রণালী সংক্রান্ত
নিয়মকানুন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত প্রদান করতে হয় তাকে। একই সঙ্গে সাধারণ পরিষদের সভাপতি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্থাটির মুখপাত্র বা প্রধান প্রতিনিধিও বটে। তাকে অধিবেশন পরিচালনা
ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হয়। সে হিসেবে এ পদটির গুরুত্ব কোনো
অংশে কম নয়। তবে জাতিসংঘের মহাসচিব এ বিশ্ব-ফোরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে
কাজ করে থাকেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে তাই মহাসচিবের সঙ্গে সমন্বয় করেই তার দায়িত্ব
পালন করতে হয়।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের গুরুত্ব অনেকাংশেই মানুষের কাছে
হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে, বিশ্বব্যাপী বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য ও গোঁয়ার্তুমির কাছে
এ সংস্থাটি একরকম অসহায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে ২৪ অক্টোবর এটি প্রতিষ্ঠিত
হয়। মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যা সমাধানে সালিশি করা; যাতে কোনো দেশ
একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়। একই সঙ্গে সারা বিশ্বের মানবাধিকার সুরক্ষা
এবং বিশ্ববাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। কিন্তু পরিতাপের
বিষয় হলো, দীর্ঘ ৮১ বছর পার হলেও জাতিসংঘ তার সে দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে সক্ষম হয়েছে,
তা সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। দেখা গেছে, দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধ
বেঁধে গেলে জাতিসংঘ এক বা দুইবার যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। সাম্প্রতিক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আমেরিকা-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে তা প্রকট হয়েই ধরা পড়েছে। এসব
যুদ্ধ-সংঘাতের বিষয়ে ভূমিকা পালনে জাতিসংঘ পরিণত হয়েছে সাক্ষীগোপালে ।
তা সত্ত্বেও সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত
হওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলদেশের পদচারণাকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করবে নিঃসন্দেহে।
তবে তা নির্ভর করছে ড. খলিলের ওপর। যেহেতু ওই পদে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন,
তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক
হিসেবে কাজ করবে। তাকে মনে রাখতে হবে, তার সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জড়িত।
তিনি যদি দায়িত্ব পালনে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, তাহলে তিনি নিজে যেমন প্রশংসিত
হবেন, তেমনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও বিশ্ব পরিমণ্ডলে উজ্জ্বল হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি
বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এ বিজয় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান
অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। মূলত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আজকের যে
অবস্থান তা দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। একসময় বাংলাদেশকে ভাবা হতো নিকট প্রতিবেশী
একটি দেশের মুখাপেক্ষী ও তল্পিবাহক রাষ্ট্র হিসেবে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বলে তখন
কিছুই ছিল না বাংলাদেশের। সে গ্লানি থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি শহীদ
জিয়াউর রহমান। তার অমর উক্তিÑ ‘পররাষ্টনীতিতে কাউকে খুশি করার দরকার নেই’-এর মধ্যেই
নিহিত ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পথচলার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। বলাই বাহুল্য,
সে পথ ধরে হেঁটেই বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের এ বিজয় একটি বড় কূটনৈতিক
সাফল্য। এজন্য আমরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানাই। সে সাথে নতুন
দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও সক্ষমতার দ্বারা তিনি বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেনÑ
এ প্রত্যাশা করি।