× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তোফায়েল আহমেদ: বাংলাদেশের উন্মেষ, বিকাশ ও বাঁকবদলের এক জীবন্ত কিংবদন্তি

আসাদুজ্জামান সম্রাট

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ১৭:৪৭ পিএম

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬ ১৮:১১ পিএম

তোফায়েল আহমেদ। ফাইল ছবি

তোফায়েল আহমেদ। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সারথি তোফায়েল আহমেদের মহাপ্রয়াণ কেবল একটি দীর্ঘ জীবনের অবসান নয়, বরং বাংলাদেশের উন্মেষ, বিকাশ ও বাঁকবদলের এক জীবন্ত কিংবদন্তির চিরবিদায়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ দিনগুলো থেকে শুরু করে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও পরবর্তী অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের চড়াই-উতরাইয়ের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক অগ্রগণ্য আলোকবর্তিকা।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে কটি নাম অবধারিতভাবে সামনে চলে আসে, তোফায়েল আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা রাজনীতিকে কেবল পেশা বা ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং একে রূপান্তর করেছিলেন আত্মত্যাগের এক মহান ব্রতে। ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে তার দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর বেশি পথচলা যেন বাংলাদেশেরই রূপান্তরের ইতিহাস। চলতি বছরের ১ জুন তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেশ হারালো ইতিহাসের এক অসামান্য ভাষ্যকার এবং কিংবদন্তি জননেতাকে।

১৯৪৩ সালের ২২শে অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। গ্রামীণ জনপদে বেড়ে ওঠা এই তরুণের মূল প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে সঁপে দেন ছাত্র আন্দোলনে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি বা ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে ডাকসু ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল সূতিকাগার। তোফায়েল আহমেদের অসামান্য বাগ্মিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতা তাকে দ্রুতই ছাত্রসমাজের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে।

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যরা যখন বন্দি, তখন বাঙালির আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তোফায়েল আহমেদ ঐতিহাসিক ১১-দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তার ডাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যে গণ-জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ভিপি তোফায়েল। তার জ্বালাময়ী বক্তৃতা ও অসাধারণ রণকৌশলের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য আসামিরা কারামুক্ত হন। এর পরদিনই, অর্থাৎ ২৩শে ফেব্রুয়ারি, রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লাখ মানুষের বিশাল গণ-সংবর্ধনায় ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ নেতা তোফায়েল আহমেদ। এই একটি ঘটনাই তাকে বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন তোফায়েল আহমেদ। এর পরই শুরু হয় একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণার পর যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তোফায়েল আহমেদ সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চার প্রধান যুবনেতার অন্যতম হিসেবে তিনি ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ বা মুজিব বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন। শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান এবং আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এই বিশেষ বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, রণকৌশল নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে তার অন্যতম প্রধান সহযোগী হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং স্নেহভাজন হিসেবে তিনি সরকারের নীতি নির্ধারণ এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে, তার আঁচ লেগেছিল তোফায়েল আহমেদের জীবনেও। সামরিক জান্তা সরকারগুলোর সময় তাকে দীর্ঘকাল কারান্তরালে কাটাতে হয়। অমানুষিক নির্যাতন ও প্রলোভনের মুখেও তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত ছিলেন। ভাঙন ও নানামুখী সংকটের মুখে আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করতে তিনি মাঠপর্যায়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। দীর্ঘ সময় তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দলকে সুসংগঠিত রেখে হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের তোফায়েল।

তোফায়েল আহমেদ স্বাধীন বাংলাদেশে মোট ৮ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে তার প্রতিটি বক্তব্য ছিল যুক্তি, তথ্য এবং ইতিহাসের উপাদানে সমৃদ্ধ। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি পুনরায় বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে তিনি প্রভূত অবদান রাখেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে তার জোরালো কণ্ঠ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছিল।

তোফায়েল আহমেদ ছিলেন মূলত মাঠের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতা। তার বক্তব্য দেওয়ার ধরণ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সাধারণ মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। দল ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণে তিনি অনেক সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। ষাটের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং সক্রিয় অংশীদার হিসেবে তার স্মৃতিচারণ ও কলামগুলো ছিল ইতিহাসের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য উপাদান।

জীবনের শেষ বছরগুলোতে তোফায়েল আহমেদ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন, স্ট্রোকের পর থেকে তিনি বেশ কয়েক বছর যাবৎ হুইলচেয়ার-নির্ভর জীবনযাপন করছিলেন। গত বছরের ২০ নভেম্বর তার সহধর্মিণী আনোয়ার আহমেদও পরলোকগমন করেন। এরপর থেকেই তিনি শারীরিকভাবে আরও ভেঙে পড়েন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং দীর্ঘ সময় লাইফ সাপোর্টে থাকার পর অবশেষে ১জুন এই বর্ষীয়ান নেতার জীবনাবসান ঘটে।

তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়া কেবল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি নয় বরং সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বিশাল নক্ষত্রের পতন। বর্তমান সময়ে যখন আদর্শভিত্তিক ও গণমুখী রাজনীতির সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তোফায়েল আহমেদের মতো ক্ষণজন্মা পুরুষদের অবদান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ইতিহাসের বরপুত্র তোফায়েল আহমেদ তার কাজের মাধ্যমে, তার কালজয়ী স্লোগানের মাধ্যমে এবং উনসত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতির মাঝে বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা