দেশে প্রতিবছর বহুসংখ্যক বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার হয়। এসব লাশের পরিচয় শনাক্ত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্বই নয়, এটি মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও বিষয়।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অজ্ঞাতপরিচয় এই লাশ শনাক্তে দেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটলেও সাফল্য এখনও আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত সাত বছরে উদ্ধার হওয়া ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশের মধ্যে ৬ হাজার ১১৬টিরই পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। বলা যায়, প্রতি ১০টি অজ্ঞাত লাশের মধ্যে প্রায় ৭টিই থেকে গেছে নাম-পরিচয়হীন। উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় লাশের প্রায় ৭২ শতাংশের পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত শনাক্ত হয় না। ফলে পরিচয় না থাকায় অনেকের ধর্মীয় বিধান অনুসারে শেষকৃত্য পালন করাও সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতা আমাদের তদন্তব্যবস্থা, তথ্যসংরক্ষণ ও সামাজিক সচেতনতার সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিএনএ ডেটাবেজ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও লাশের সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার এবং আন্তঃসংস্থার ডিজিটাল সমন্বয় ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে পিবিআই প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৫৭ হাজার
৩৫৪টি মামলার তদন্ত করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ২০টির নিষ্পত্তি হয়েছে। তদন্তাধীন
৯ হাজার ৩৩৪টি মামলা। যদিও সংস্থাটি লাশ শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর যুগে প্রবেশ করে ২০১৯
সালে এফআইভিইএস চালুর মাধ্যমে। কিন্তু সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, রয়ে গেছে বড় এক সংকট।
এখনও নাম-পরিচয়হীনের পাল্লাই যথেষ্ট ভারী।
পিবিআইয়ের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত
৭ বছরে উদ্ধার হওয়া ৬ হাজার ১৮৪টি অজ্ঞাত পুরুষ লাশের মধ্যে শনাক্ত করা গেছে ১ হাজার
৭১১টি। অশনাক্ত রয়ে গেছে ৪ হাজার ৪৭৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে
উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ২৭২টি অজ্ঞাত নারী লাশের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৬২৯টি। অশনাক্ত রয়ে
গেছে ১ হাজার ৬৪৩টি। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সর্বমোট ৮ হাজার ৪৫৬টি অজ্ঞাত
লাশের মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৩৪০টির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬ হাজার ১১৬টি
মরদেহ এখনও পরিচয়হীন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, প্রযুক্তির ব্যবহার করা হলেও অজ্ঞাত
লাশ শনাক্তে রাষ্ট্র এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে।
একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া মৌলিক
মানবাধিকারের অংশ। পরিচয়হীন অবস্থায় দাফন হওয়া মানে তার পরিবার-পরিজনের কাছে
চিরস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। বহু পরিবার বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায়
থাকে, হয়তো সেই ব্যক্তি অজ্ঞাত লাশ হিসেবে কোথাও দাফন হয়ে গেছে।
পিবিআইয়ের অনুসন্ধান থেকে বোঝা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে
লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে। অনেক সময় উদ্ধারকৃত লাশের
সঙ্গে কোনো পরিচয়পত্র থাকে না। দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড বা প্রাকৃতিক কারণে বিকৃত হয়ে
যাওয়া লাশ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার ও
উদ্ধার হওয়া লাশের তথ্যের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
এখনও পর্যাপ্ত নয়। উন্নত দেশগুলোতে ডিএনএ ডেটাবেজ, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং কেন্দ্রীয়
নিখোঁজ ব্যক্তি তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের হার অনেক বেশি। বাংলাদেশেও
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও বায়োমেট্রিক তথ্যের বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে। এসব
তথ্যকে তদন্ত কার্যক্রমের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা গেলে পরিচয় শনাক্তের
হার বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিটি অজ্ঞাত লাশের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ এবং
ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি।
আরেকটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে দ্রুত জিডি করা এবং তথ্য হালনাগাদ
রাখা। অনেক পরিবার সামাজিক সংকোচ, অর্থনৈতিক অসুবিধা বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে
দ্রুত থানায় যোগাযোগ করে না। ফলে সময়মতো তথ্য আদান-প্রদান না হওয়ায় শনাক্তকরণ
প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুলিশি সেবাকে
আরও সহজলভ্য করতে হবে।
শনাক্ত না হওয়া ৭২ শতাংশ বেওয়ারিশ লাশের এই হার আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্যভান্ডারের সমন্বয়, আন্তঃসংস্থার সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব। এই ক্ষেত্রে পিবিআইয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তর বা সিআইডির তত্ত্বাবধানে একটি যাচাইকৃত অনলাইন প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে নিয়মিত এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারে। তবে তথ্যের গোপনীয়তা, সত্যতা ও অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর থাকতে হবে। মনে রাখা দরকার, অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অসংখ্য পরিবারকে বেদনা, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটাতে হয় দিনরাত্রি। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করাই নয়, পরিচয়হীন হয়ে যাওয়া একজন নাগরিককে তার নাম, পরিচয় ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াও সমান দায়িত্ব। তাই সেই দায়িত্ব পালনে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।