হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ১২:৩৬ পিএম
একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল রক্ত, ধ্বংস আর মানুষের আর্তনাদ। ইতিহাসের প্রতিটি বড় যুদ্ধ মানবসভ্যতাকে প্রযুক্তিতে এগিয়ে দিলেও, একই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে কোটি কোটি প্রাণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম, ইউক্রেন-রাশিয়, আফগানিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতÑ সব জায়গাতেই মানুষ ছিল যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র এবং প্রধান শিকার। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন যুদ্ধের চরিত্রও পাল্টে দিচ্ছে দ্রুত। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা দেখছি এক নতুন বাস্তবতা, যেখানে মানুষ নয়, যন্ত্রই হয়ে উঠছে প্রধান যোদ্ধা।
ইউক্রেনের
বাংকারে এখন শুধু গানপাউডারের গন্ধ নেই; সেখানে জ্বলছে মনিটরের নীল আলো, শোনা যাচ্ছে
কিবোর্ড আর মাউসের ক্লিক। সামনের সারির ট্রেঞ্চে বসে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করার বদলে
দূরের নিরাপদ কক্ষে বসেই শত্রুপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন প্রযুক্তিবিদরা। চালকহীন
ড্রোন, বিস্ফোরকবাহী রোবট, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থাÑ সব মিলিয়ে যুদ্ধ যেন ধীরে
ধীরে মানুষের হাত থেকে সরে গিয়ে যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে ভয়ংকর
বলে মনে করতে পারেন। কারণ যুদ্ধ কখনোই মানবিক নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যদি যুদ্ধ
থামানো সম্ভব না হয়, তবে অন্তত মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাটিই এখন
সবচেয়ে মানবিক বিকল্প হয়ে উঠছে। যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের যুদ্ধÑ এই ধারণা একসময় বিজ্ঞান
কল্পকাহিনীর বিষয় ছিল, অথচ আজ তা বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।
ইউক্রেনের উদাহরণ
আমাদের দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি কেবল ধ্বংসের জন্য নয়, মানুষের জীবন রক্ষার জন্যও ব্যবহার
করা যেতে পারে। যে কাজ আগে হাজার হাজার সেনাকে জীবন বাজি রেখে করতে হতো, এখন তা কয়েকটি
রোবটই সম্পন্ন করছে। একটি চালকহীন রোবট যদি মাইন নিষ্ক্রিয় করতে পারে, তাহলে কোনো তরুণ
সৈনিককে আর নিজের হাত-পা হারাতে হবে না। যদি ড্রোন খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে
শত্রুর গুলির মুখে পড়ে আর কোনো রসদবাহী গাড়ি ধ্বংস হবে না। যদি যান্ত্রিক যান সম্মুখযুদ্ধে
অংশ নেয়, তাহলে কোনো মা তার সন্তানের লাশের অপেক্ষায় থাকবেন না।
যুদ্ধক্ষেত্রে
রোবটের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। বর্তমানে যেসব রোবট বিস্ফোরক বহন বা
গুলি চালাচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা আহত সৈনিকদের উদ্ধার করতে পারবে, আগুন নেভাতে পারবে,
রাসায়নিক হামলার জায়গায় প্রবেশ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এমনকি কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর যুদ্ধযন্ত্র শত্রুর অবস্থান বিশ্লেষণ করে সংঘর্ষ এড়ানোর
পথও খুঁজে বের করতে সক্ষম হতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হচ্ছে, যন্ত্রের কোনো আবেগ নেই। মানুষের মতো প্রতিশোধস্পৃহা, ঘৃণা বা ভয় তাদের
কাজকে প্রভাবিত করে না। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও
প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, রিয়েল-টাইম
তথ্য বিশ্লেষণ এবং উন্নত সেন্সর ব্যবস্থার মাধ্যমে ভুল হামলার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো
সম্ভব। অর্থাৎ প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমিয়ে আনা যেতে পারে।
তবে এর বিপরীত
দিকও আছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ মানবিক দূরত্ব তৈরি করে। যখন কেউ হাজার মাইল দূরে
বসে একটি বোতাম চেপে আক্রমণ চালায়, তখন যুদ্ধের বাস্তব ভয়াবহতা তার কাছে অনেক সময় ভিডিও
গেমের মতো মনে হতে পারে। এতে যুদ্ধ শুরু করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও হয়তো সহজ হয়ে যেতে
পারে। কারণ তখন রাষ্ট্রগুলো ভাবতে পারেÑ ‘আমাদের সৈন্য তো মরছে না।’ এই মনোভাব মানবজাতির
জন্য নতুন বিপদ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বড় আশঙ্কা
হচ্ছে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ। যদি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের হাত থেকে সরে যেতে পারে।
একটি ভুল অ্যালগরিদম, একটি সাইবার হামলা কিংবা একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি ভয়াবহ বিপর্যয়
ডেকে আনতে পারে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৈতিক নীতিমালা
ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও জরুরি।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলো
ইতোমধ্যে ‘রোবটিক ওয়ারফেয়ার’ নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া,
ইসরায়েলÑ সবাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর অস্ত্র তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিতÑ প্রযুক্তি কি মানবজীবন রক্ষার জন্য ব্যবহৃত
হবে, নাকি আরও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অর্জনের জন্য?
মানবসভ্যতা যদি
সত্যিই উন্নত হতে চায়, তাহলে যুদ্ধের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে বাঁচানো, হত্যা নয়।
পৃথিবীতে সীমান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হয়তো কখনোই শেষ হবে
না। কিন্তু সেই সংঘাতের মূল্য যেন আর মানুষের জীবন দিয়ে শোধ করতে না হয়। যুদ্ধ যদি
অনিবার্য হয়ও, তবে সেখানে মানুষের বদলে যন্ত্র অংশ নিকÑ এই চিন্তাকে এখন গুরুত্বের
সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আজকের শিশুদের
ভবিষ্যৎ এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে তারা বড় হয়ে বন্দুক হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাবে। বরং
তারা যেন প্রযুক্তি তৈরি করে, যা যুদ্ধ থামাবে, জীবন বাঁচাবে এবং মানবিক ক্ষতি কমাবে।
একজন তরুণ প্রোগ্রামার যদি এমন একটি রোবট তৈরি করতে পারে, যা শত মানুষের জীবন রক্ষা
করবে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত মানবিক বিজয়।
ইউক্রেন যুদ্ধ
আমাদের সামনে নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। প্রযুক্তি যেমন ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তেমনি
তা মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচও হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলাতে
হবে। যুদ্ধ আর মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ নয়; বরং যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ
থাকুক। মানবসভ্যতা যেন অন্তত এই শিক্ষা নেয়Ñ কোনো ভূখণ্ড, কোনো ক্ষমতা, কোনো রাজনৈতিক
স্বার্থই একটি মানুষের জীবনের চেয়ে বড় নয়।
মানুষ বাঁচুক, মানবতা টিকে থাকুকÑ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার সেখানেই হওয়া উচিত।
হাবিব বাবুল
জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক