× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘আমরা’ই হোক আমাদের বড় পরিচয়

কাজী জিয়া উদ্দীন

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ১০:৫২ এএম

মানুষ একক কোনো সত্তা নয়; সে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সম্মিলিত নির্মাণ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মানুষ একক কোনো সত্তা নয়; সে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সম্মিলিত নির্মাণ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মানুষ একক কোনো সত্তা নয়; সে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সম্মিলিত নির্মাণ। অথচ আমাদের সমাজে ‘আমি’ এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে ‘আমরা’ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত বিভাজন, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও আত্মকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার ভিড়ে যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ আজ প্রায় অনুপস্থিত। আমরা একই ভূখণ্ডে বাস করি, কিন্তু একই সামাজিক চেতনায় বাস করি না।

বিশ্বের অনেক দেশ এই সংকট অতিক্রম করে সামাজিক সংহতিকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে ‘গলনপাত্র সংস্কৃতি’ (মেলটিং পট) ধারণার মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের অধীনে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। পরবর্তীতে ‘সালাদ বাটি সংস্কৃতি’ ধারণা দেখিয়েছে, ভিন্নতা মুছে না দিয়েও ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। একজন মানুষ নিজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখেও বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের অংশ হতে পারেন। অর্থাৎ বৈচিত্র্যকে বিভাজন নয়, শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতা সেখানে বিকশিত হয়েছে।

জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে নয়, গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলাবোধের ভিত্তিতে। দেশটির নাগরিক জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ অত্যন্ত শক্তিশালী। ট্রেন, সড়ক, কর্মক্ষেত্র কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বত্রই সম্মিলিত দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমাজের ক্ষতিকে তারা ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবেই বিবেচনা করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সেমাউল উন্দং’ বা ‘নতুন গ্রাম আন্দোলন’ ছিল কেবল একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি ছিল সামাজিক সংহতি, আত্মনির্ভরতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য উদাহরণ। গ্রামকে কেন্দ্র করে মানুষকে শেখানো হয়েছিলÑ রাষ্ট্র কেবল সরকারের নাম নয়, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণেরও নাম। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র একটি দেশ কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যার পর দেশটি প্রতিশোধের পথ পরিহার করে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনের নীতি গ্রহণ করে। জাতিগত বিভাজন অতিক্রম করে একটি সম্মিলিত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, সামাজিক পুনর্মিলন ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে রুয়ান্ডা আজ আফ্রিকার অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দ্রুত অগ্রসরমান রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত সমাজও সম্মিলিত চেতনা ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে পুনর্গঠিত হতে পারে।

সিঙ্গাপুর বহুজাতিক সমাজ হয়েও নাগরিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সামাজিক আস্থার ভিত্তিতে একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে নরওয়ে, সুইডেনসহ নর্ডিক দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক মর্যাদার সংস্কৃতি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে নাগরিকরা রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেন।

কানাডা বহুসংস্কৃতিবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করে দেখিয়েছে, ভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষও পারস্পরিক সম্মান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী জাতি গঠন করতে পারে। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত ও বিধ্বস্ত বাস্তবতা থেকে উঠে এসে জার্মানি নাগরিক দায়বদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক আস্থার মাধ্যমে আধুনিক ইউরোপের অন্যতম স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থাও উল্লেখযোগ্য। সেখানে কেবল জ্ঞানার্জন নয়, সামাজিক সমতা, সহযোগিতা ও সম্মিলিত উন্নয়নের চেতনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রতিযোগিতার চেয়ে অংশগ্রহণমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান।

কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে মতভেদ প্রায়ই বৈরিতায় রূপ নেয়, সমালোচনা শত্রুতা হিসেবে বিবেচিত হয়, আর সংস্কারের প্রস্তাব জন্ম দেয় সন্দেহের। আমরা অনেক সময় যুক্তির চেয়ে তর্কে, সহমর্মিতার চেয়ে প্রতিযোগিতায় এবং সহযোগিতার চেয়ে আত্মপ্রচারে বেশি অভ্যস্ত। ফলে নতুন কোনো মানবিক বা প্রগতিশীল ধারণা সামনে এলে তা গ্রহণের আগে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ‘এতে লাভ কী?’, ‘এটা বিদেশি সংস্কৃতি’, কিংবা ‘এটা বাস্তবসম্মত নয়’Ñ এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আমাদের মানসিক স্থবিরতারই পরিচায়ক।

মূল সমস্যা হলো, আমরা এখনও সামাজিক পরিচয়কে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ সীমার মধ্যে দেখতে অভ্যস্ত। অথচ একটি সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত চেতনা। কারণ কেবল আইন দিয়ে সভ্যতা নির্মিত হয় না; তা গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, আস্থা ও অংশগ্রহণের সংস্কৃতির মাধ্যমে।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সামাজিক পুনর্জাগরণ। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভিন্ন মতকে শত্রুতা নয়, সমৃদ্ধির উপাদান হিসেবে দেখা হবে; যেখানে ধর্ম, ভাষা, শ্রেণি কিংবা মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষ বৃহত্তর মানবিক পরিচয়ে একত্র হতে শিখবে। কারণ ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ কোনো স্লোগান নয়; এটি টেকসই সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ভাষায়, “আমাদের ভাইয়ের মতো একসঙ্গে বসবাস করতে শিখতে হবে, নতুবা নির্বোধের মতো একসঙ্গে ধ্বংস হতে হবে।” আফ্রিকার মানবতাবাদী দর্শন ‘উবুন্টু’ও একই কথা বলেনÑ ‘আমি আছি, কারণ আমরা আছি।’ অর্থাৎ ব্যক্তির অস্তিত্বও সমষ্টির মধ্যেই পূর্ণতা লাভ করে। এই ভাবনাগুলোর মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিহিত। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়, যখন মানুষ শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য ভাবতে শেখে।

প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজে সেই সম্মিলিত চেতনার শঙ্খধ্বনি তুলবে কে? কে শেখাবে যে ভিন্নতা বিভাজন নয়, সম্ভাবনা? কে দেখাবে যে সামাজিক সংহতি কোনো কল্পনা নয়, বরং উন্নত সভ্যতার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি?

যতদিন আমরা ব্যক্তিস্বার্থের সংকীর্ণ বলয় অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক মানবতার দিকে অগ্রসর হতে না পারব, ততদিন উন্নয়নের অট্টালিকা নির্মিত হলেও সমাজের ভিত দুর্বলই থেকে যাবে। তখন যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ বইয়ের পৃষ্ঠা, বক্তৃতা কিংবা সেমিনারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবেÑ মানুষের বাস্তব জীবনে নয়।


কাজী জিয়া উদ্দীন

অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা