বাংলাদেশের অর্থকরী পণ্যের মধ্যে পশুর চামড়া অন্যতম। পূর্বে পাট, চা ও চামড়াকে দেশের প্রধান অর্থকরী পণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো।
এসব পণ্যই ছিল আমাদের দেশের রপ্তানি খাতের লাইফলাইন। নানা কারণে পাটের বাজার হয়েছে সীমিত, চা শিল্পও পড়েছে বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে। বাকি ছিল চামড়া। সেটাও গত প্রায় দেড় দশক ধরে মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত। আমাদের দেশে পশুর চামড়া সংগ্রহের প্রধান মৌসুম ঈদুল আজহা। প্রতিবছর ঈদের সময় যেসব পশু কোরবানি করা হয়, সেগুলোর চামড়া আমাদের চামড়া শিল্পকে বলা যায় বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চামড়া শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা দূরের কথা, খোদ চামড়াবাজারই ধুঁকছে। মূলত চামড়াবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এজন্য দায়ী।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলÑ
‘প্রায় অমূল্যে চামড়া’। অর্থাৎ এবারেও কোরবানির পশুর চামড়া অদামে বিক্রি করতে বাধ্য
হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবারের ন্যায় এবারও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে
চামড়ার দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও বিক্রি হয়নি এক খণ্ড
চামড়া। বিক্রি করতে না পেরে অনেকে চামড়া ফেলে দিয়েছেন নদীতে, কেউ পুঁতে দিয়েছেন মাটিতে।
বলা বাহুল্য, এর ফলে দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য বিনষ্ট হয়েছে। পূর্বে কোরবানির ঈদের
দিন সকালেই মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা খরিদ করার জন্য ধরনা দিত। আর
এখন কোরবানিদাতারা জবাইকৃত পশুর চামড়া নেওয়ার জন্য কাউকে খুঁজে পান না।
কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়লব্ধ অর্থ কোরবানিদাতারা নেন না। ইসলামধর্মের
বিধান অনুযায়ী এর হকদার গরিব-মিসকিনরা। অনেকে চামড়া স্থানীয় মাদ্রসা-এতিমখনায় দান করেন।
তারা আড়তে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এতিম শিশুদের খাওয়াপরার ব্যয়ের একটি অংশ পূরণ
করেন। চামড়ার মূল্য কম থাকায় মাদ্রাসা-এতিমখানাগুলোও তা সংগ্রহ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
কেননা, সংগ্রহকৃত চামড়া লবণ মাখিয়ে প্রাথমিক সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করে আড়তে নিয়ে গেলে
যে দাম পাওয়া যায়, তাতে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন খরচও ওঠে না। এটা সাংবাৎসরিক চিত্রে
পরিণত হয়েছে।
সরকার এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু
সে নির্ধারিত মূল্যে কোথাও চামড়া বিক্রি হয়নি। সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিলÑ গরুর চামড়া
প্রতি বর্গফুট রাজধানীতে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, আর ঢাকার বাইরে ৫৭ টাকা থেকে ৬২ টাকা। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে
৩০ টাকা, আর বকরির চামড়া ২২ টাকা থেকে ২৫ টাকা বর্গফুট। সে হিসাবে লবণ মাখানো একটি
বড় গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। ছোট একটি গরুর চামড়ার
বিক্রি হওয়ার কথা এক হাজার থেকে বারোশ টাকা। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়ার দাম হওয়ার
কথা ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু চামড়ার বাজার মূল্য এর ধারেকাছেও
নেই। একটি বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এদিকে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে প্রেরিত খবরে
বলা হয়েছে, লাভের আশায় চামড়া কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। আড়তদাররা
কম দামে চামড়া কেনায় এবারও তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। প্রতিটি চামড়া গড়ে ৩০০ টাকা
দরে কিনলেও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। কয়েকজন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, তারা আড়তদারদের কারসাজিতে সরকার নির্ধারিত দামের
চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আড়তদাররা বলেছেন, ভালো মানের
চামড়া তারা ভালো দামেই কিনেছেন। যেসব চামড়ার মান খারাপ ছিল, সেগুলো কম দামে কিনেছেন।
বিক্রি করতে না পেরে অনেকে চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন, কেউবা পুঁতে দিয়েছেন মাটিতে।
একই ঘটনা ঘটেছে ফেনী, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এসব এলাকায় রাস্তার
পাশে মালিকবিহীন চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে আড়তদার-সিন্ডিকেটের এই কামড়াকামড়ি ফি বছরই চলে আসছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ বেরোয়, লেখা হয় সম্পাদকীয়-উপ সম্পাদকীয়। আলোচনা হয় টিভি টকশোতে। এ অব্যবস্থার প্রতিকারের জন্য সরকারকে দেওয়া হয় পরামর্শ। কিন্তু অবস্থা থাকে তথৈবচ। অভিজ্ঞমহলের মতে, চামড়া নিয়ে যে অব্যবস্থা ও অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি চলে আসছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও নিরসনের জন্য সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনেকের মতে, চামড়া ব্যবসায় পুরোপুরি যাতে সিন্ডিকেট কবলিত না হয়, সেজন্য সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সরকারকেই সৃষ্টি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি চামড়া ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয় সুফল বয়ে আনতে পারে। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সরকারের তত্ত্বাবধানে ক্রয়কেন্দ্র খুলে নির্ধারিত মূল্যে চামড়া ক্রয় করলে আড়তদার-সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে। এতে ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা যেমন লোকসানের হাত থেকে রেহাই পাবে, তেমনি গরিব-মিসকিনরাও তাদের ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে না। আর তাহলে আমাদের অন্যতম অমূল্য সম্পদ পশুর চামড়া আর ‘অমূল্যে’ (নিম্নমূল্যে) বিক্রি করতে কেউ বাধ্য হবে না।