শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬ ১২:২৯ পিএম
বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) কোনো সাধারণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে কঠোর গোপনীয়তায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে একটি গভীর রূপান্তর তৈরি করেছে। চুক্তির ধারাগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সমতা রক্ষার আইনি মোড়ক থাকলেও, এতে ক্ষমতার অসমতা ও একপাক্ষিক বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সাথে এটি এশিয়ার তিন পরাশক্তিÑ ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়ে দেশের অখণ্ডতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এক অভূতপূর্ব হুমকি তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের (Executive Order 14257) মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর অতিরিক্ত ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ (RT) বা পালটা শুল্ক আরোপ করেন। এর ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের (বিশেষত তৈরি পোশাক) শুল্কহার আগের ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এক লাফে প্রায় ৩৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছে। এই ধাক্কায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে চরম বিপর্যয় এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে গভীর নাভিশ্বাস দেখা দেয়।

এই সংকটকালীন
পরিস্থিতিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন প্রশাসনের
সাথে দ্রুত আলোচনা শুরু করে। আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন
ও ঢাকার মধ্যে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (ART) সই হয়।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার রিসিপ্রোকাল শুল্ক হার পূর্বের হার থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ
নির্ধারণ করে। তবে বাণিজ্য খাতের বোদ্ধাদের মতে, মার্কিন বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক গড়
শুল্ক ১৫.৫ শতাংশ বহাল থাকায়, এই অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ যুক্ত হয়ে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর
মোট শুল্কের বোঝা দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫ শতাংশে।
চুক্তিটি কাগজে-কলমে ‘পারস্পরিক’ বা রিসিপ্রোকাল
বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে এটি চরমভাবে একপাক্ষিক ও বাধ্যতামূলক শর্তে ঠাসা। চুক্তিটি
চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ‘নন-ডিসক্লোজার’ বা তথ্য গোপন রাখার আইনি সুরক্ষার আশ্রয় নেওয়া
হয়েছিল, যা দেশের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার গণশুনানি বা অংশীজনদের (যেমন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ)
সাথে আলোচনার সুযোগ দেয়নি।
চুক্তির মূল অর্থনৈতিক শর্তগুলোতে বাংলাদেশকে মার্কিন
কৃষি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতের জন্য নিজের বাজার উন্মুক্ত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা
দেওয়া হয়েছে। এর প্রধান শর্তসমূহ নিম্নরূপ :
ক. চুক্তির শর্ত
অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতিবছর ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন কৃষি পণ্য (গম,
সয়াবিন, তুলা এবং ভুট্টা) কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের
মতে, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যতামূলক ক্রয় চুক্তি মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থী
এবং এটি বাংলাদেশের দেশীয় কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও করপোরেট পুঁজিমুক্ত স্বাধীন বাজারকে
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
খ. আগামী ১৫ বছরে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য (প্রধানত এলপিজি ও
গ্যাস) আমদানির বাধ্যবাধকতা এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব
জ্বালানি কৌশল নির্ধারণের ক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে।
গ. চুক্তির একটি
বড় অংশজুড়ে রয়েছে আমেরিকার বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি (Big Tech) এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোকে
বাংলাদেশে কোনো ধরনের শুল্ক বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ব্যবসা করার অবাধ সুযোগ দেওয়া।
এর ফলে বাংলাদেশের উদীয়মান অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি খাত ও স্টার্ট-আপগুলো অসম প্রতিযোগিতার
মুখে পড়বে এবং দেশীয় ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
চুক্তির একটি
ইতিবাচক দিক হিসেবে প্রচার করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত
তুলা (US Cotton) এবং কৃত্রিম তন্তু (Man-made fiber) আমদানি করে তা দিয়ে পোশাক তৈরি
করে, তবে সেই নির্দিষ্ট পোশাকগুলো মার্কিন বাজারে সম্পূর্ণ ‘শূন্য শুল্ক’ (Zero
Tariff) সুবিধা পাবে।
আপাতদৃষ্টিতে
এটিকে পোশাক খাতের জন্য বড় সুযোগ মনে হলেও এর ভেতরে একটি বড় বাণিজ্যিক ফাঁদ রয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত ভারত, পাকিস্তান বা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কম খরচে এবং দ্রুত সময়ে
তুলা ও সুতা আমদানি করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করতে গেলে দীর্ঘ
দূরত্বের কারণে পরিবহন খরচ ও জাহাজীকরণ সময় (Lead Time) বহুগুণ বেড়ে যাবে। ফলে শূন্য
শুল্কের সুবিধা পেলেও তা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
‘এআরটি’ চুক্তিটি কেবল শুল্ক আর বাণিজ্যের গণ্ডির
মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর চতুর্থ অধ্যায়ের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে (Article 4.2) এমন কিছু শর্ত
যুক্ত করা হয়েছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত।
এই শর্তগুলোর
ART চুক্তির অনুচ্ছেদ ৪.২ : নিরাপত্তা বাধ্যবাধকতাগুলো হলো :
ক. জাতীয় নিরাপত্তা-সংবেদনশীল
প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার (US Export
Controls) সাথে মিল রাখা।
খ. মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
(US Sanctions) লঙ্ঘন করে এমন যেকোনো লেনদেন বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বাংলাদেশে
নিষিদ্ধ করা।
গ. দেশের অভ্যন্তরে
আসা যেকোনো বৈদেশিক বিনিয়োগের (Inbound Investment) তথ্য ও স্বচ্ছতা মার্কিন প্রশাসনের
সাথে শেয়ার করা। শর্তগুলোর কারণে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ
পররাষ্ট্রনীতিÑ ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ তা বজায় রাখতে চরম সংকটে
পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, চীন, রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের বিনিয়োগ বা বাণিজ্য যদি
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকে, তবে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দেশগুলোর সাথে
অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হবে। এটি সরাসরি ভিয়েনা কনভেনশন (VCLT 1969) এবং
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে
বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এ যেন একটি বাণিজ্য চুক্তির আড়ালে বাংলাদেশকে
নির্দিষ্ট একটি পরাশক্তির ‘প্রক্সি স্টেট’ বা ভূ-রাজনৈতিক ভূখণ্ডে পরিণত করার প্রচ্ছন্ন
প্রয়াস।
বিশ্লেষণে দেখা
যায়, ‘এআরটি’ শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষমতাই কেড়ে নেয়নি, বরং এটি
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলেই যেকোনো দেশের সাথে শুল্ক বা
কর সংক্রান্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি
ও কৃষি আমদানির বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশ ডলার সংকটের সময়েও মার্কিন পণ্য কিনতে
বাধ্য থাকবে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করবে এবং
জাতীয় বাজেট প্রণয়নে পরোক্ষ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এমন এক সংবেদনশীল অবস্থানে
অবস্থিত, যা দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
চীন এবং ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ‘এআরটি’ চুক্তিটি এই অঞ্চলে শক্তির
ভারসাম্যকে চরমভাবে বিঘ্নিত করেছে, যা বাংলাদেশের অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাত হানতে পারে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, কক্সবাজার এবং কুয়াকাটা উপকূলীয়
অঞ্চলের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের টানাপড়েন রয়েছে। এই চুক্তির
মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার সহজ হওয়ায়,
বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম হতে পারে।
চুক্তিটি সম্পাদনের প্রক্রিয়ায় দেশের সর্বোচ্চ আইন
অর্থাৎ সংবিধানকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, বহির্বিশ্বের
সাথে যেকোনো বড় চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা এবং তা মন্ত্রিসভায়
বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারের বিদায়বেলার এই ‘এআরটি’ চুক্তিটি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায়
হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মার্কিন বাজারের শুল্কের জুজু দেখিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক
অর্থনীতি, কৃষি এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে একপাক্ষিক শর্তের বেড়াজালে বেঁধে ফেলার এই কৌশল
কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়।
নির্বাচিত সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে এই চুক্তির প্রতিটি ধারা দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা। প্রয়োজনে চুক্তির অসম শর্তগুলো সংশোধনের জন্য মার্কিন প্রশাসনের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধাই টেকসই হতে পারে না। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চে স্থান দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করাই হবে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক