ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬ ১২:৪০ পিএম
তার জন্মের দিনটিতে আনন্দের পাশাপাশি আমার কাঁধে যেন এক বিশাল দায়িত্বও এসে ভর করেছিল।
বুকের ভেতর চাপা এক ভয় কাজ করছিলÑ এই ফেতনার যুগে আমি কি পারব আমার কন্যাকে একজন সৎ, মানবিক ও দ্বীনদার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে? তাকে কি নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শিষ্টাচার ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিতে পারব?
একজন নতুন বাবা
হিসেবে সেদিন অসংখ্য অজানা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে
সেই ব্যক্তিগত উদ্বেগ আজ আরও বড় এক সামাজিক আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। টেলিভিশনের লাল ব্রেকিং
নিউজ, পত্রিকার মোটা হরফের শিরোনাম আর সামাজিক মাধ্যমের প্রতিদিনের খবর যেন একটাই প্রশ্ন
ছুড়ে দেয়Ñ ‘আমাদের কন্যাসন্তানগুলো কোথায় নিরাপদ?’একসময় বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা শুরু
হতো সন্তান বড় হওয়ার পর। কিন্তু আজ বাস্তবতা এতটাই ভয়ংকর যে কোনো বয়সই আর নিরাপদ মনে
হয় না।
আগে মানুষ সন্তানকে
স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে ভয় পেতÑ না জানি কোনো নিকৃষ্ট হায়েনার শিকার হয় কি না! অথচ আজ পরিস্থিতি
এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি কন্যাশিশু তার নিজ ঘরেও, আত্মীয়স্বজনের মাঝেও, পরিচিত মানুষের
কাছেও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।মাগুরার আছিয়া, কুমিল্লার তনু, সাম্প্রতিক মিরপুরে রামিসাÑ
প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এসব
ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের কান্না নয়; এগুলো পুরো জাতির বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশ্ন
হলোÑ কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? এর অন্যতম বড় কারণ মাদকের ভয়াবহ বিস্তার।
আজ সমাজের বহু
মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ ইয়াবা ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের ভয়াল ছোবলে
আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। পরিকল্পিতভাবে একটি প্রজন্মকে নৈতিকভাবে দুর্বল ও দায়িত্বহীন
করে তোলার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান
পদক্ষেপ খুব কমই দেখা গেছে। বরং অতীতে আমরা দেখেছিÑ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেককেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে
প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
আরেকটি বড় কারণ
হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। নারী ও শিশু ধর্ষণের বহু মামলায় বিচার বছরের পর বছর ঝুলে
থাকে। অনেক অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর, প্রভাব বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে জামিনে বের হয়ে
আসে। আবার কোনো কোনো মামলার রায় কার্যকর হতে এত দীর্ঘ সময় লাগে যে মানুষ ঘটনাটিই ভুলে
যায়।
আমরা এমন একটি
সমাজ চাই, যেখানে কোনো বাবা তার কন্যা সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাবে না। যেখানে
একটি শিশু নিরাপদে বড় হবে পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও সমাজে। যেখানে অপরাধীর পরিচয়
নয়, অপরাধই হবে বিচারের একমাত্র ভিত্তি। আর যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশু মর্যাদা, নিরাপত্তা
ও ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পাবে।
দুই.
বাবা-মায়ের সবচেয়ে
আপন, সবচেয়ে প্রিয় হলো তার সন্তান। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেবল সেই বাবা-মাই অনুভব
করতে পারেন, যাদের বুক শূন্য হয়েছে। সন্তানকে যেকোনোভাবেÑ অপঘাতে, অবহেলায় কিংবা নির্মম
অপরাধের শিকার হয়েÑ দুনিয়া থেকে বিদায় দিতে হওয়া কোনো বাবা-মায়ের জন্যই সহজ বা স্বাভাবিক
বিষয় নয়। হোক সেটা ধর্ষণ, কিংবা ধর্ষণের পর হত্যাÑ প্রতিটি ঘটনাই একটি পরিবারের জীবনে
চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
আজ দেশে হামের
ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলছে। রাষ্ট্র নাকাল, আতঙ্কিত সাধারণ মানুষও। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক
ও সামাজিক-সংস্কৃতির একটি দুঃখজনক দিক হলোÑ যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তার ব্যর্থতা বা
জনকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে তখন খুব কমই উচ্চকণ্ঠ হওয়া যায়। অথচ সরকার বদলের পরই
পুরনো সব ব্যর্থতার ফিরিস্তি সামনে আসে।
আজ প্রশ্ন উঠছেÑ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রয়োজনীয় হামের টিকা কেন কেনা হয়নি, কেন যথাসময়ে সরবরাহ
নিশ্চিত করা হয়নি। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তখনই সাংবাদিক সমাজ, সংশ্লিষ্ট
মহল কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কেন যথাযথভাবে বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরলেন না?
এখন হামকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দোষারোপের প্রতিযোগিতা চলছে।
স্বীকার করতে
দ্বিধা নেই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা ছিল। এমনকি স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কিছু
বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড অজ্ঞতার পরিচয় বহন করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ
বর্তমান সরকার কি শুধুই আগের সরকারের ব্যর্থতার দায় দেখিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে
পারে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
নিয়মিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা
দেওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ২৭৯ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,
শুধু সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (১৫ মে) নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছে ২০৮ জন। ১৫ মার্চ
থেকে এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ২৭৫ শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
একই সময়ে হামের
উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৬ হাজার ৪০৭ শিশু। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল
ছেড়েছে ৪২ হাজার ৩৩৬ শিশু। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য হলোÑ ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত
হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪০৫ শিশু, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৮৩ শিশুর। মোট মৃত্যু
৪৮৮।
তাহলে প্রশ্ন
উঠতেই পারেÑ যদি সত্যিই অবহেলা বা গাফিলতি থেকে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নেওয়া হচ্ছে না কেন? কেন স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর
আইসোলেশন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে না?
হাম নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যক্রমের গতি দেখে নাগরিক হিসেবে যেমন শঙ্কিত হতে হয়, তেমনি আশাহতও হতে হয়। আর কত শিশুর প্রাণ ঝরলে দোষারোপের রাজনীতি থামবে? আর কত কচি মুখ নিথর হলে জাতি হিসেবে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে? এই প্রশ্ন আজ দেশের দায়িত্বশীলদের কাছে। সাধারণ মানুষ আইনের জটিল মারপ্যাঁচ বোঝে না। তারা শুধু চায়Ñ অপরাধের সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত বিচার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা। খেটে খাওয়া মানুষ ইউনিসেফ বা জাতিসংঘের কূটনৈতিক ভাষা বোঝে না; তারা বোঝে তাদের সন্তানের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, আর একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা।
ফজলে মিনহাজ
কলাম লেখক