পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে কর্মমুখী মানুষ। প্রতি বছরের ঈদযাত্রার মতো ঈদ-পরবর্তী ফেরার যাত্রাও দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে কর্মজীবনে ফিরে আসার এই যাত্রা যেন স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়Ñ এমনটাই সবার প্রত্যাশা থাকে। তবে অন্যবারের তুলনায় এবার ফিরতি যাত্রায় চাপ তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। দুয়েক দিনের মধ্যে রাজধানীমুখী ফেরার চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বলা যায়, ঈদের টানা ছুটি শেষে মানুষের রাজধানীমুখী ফেরা অনেকটাই নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক হচ্ছে। উল্লেখ্য, এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি উপভোগ করেছেন। ছুটি শেষে অফিস-আদালত, ব্যাংকসহ নানা প্রতিষ্ঠান খুলছে। সরকারের একই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে ছুটি ভোগ করছে বিভিন্ন বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও।
এ
কথা সত্য যে, দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। ঈদের
ছুটিতে রাজধানী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেলেও ছুটি শেষে আবার কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে
ওঠে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল
রাখতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে একই সময়ে ঢাকায় ফিরতে হয়। ফলে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীর
চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আগাম প্রস্তুতি ও
কার্যকর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের
আগে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফেরার পথে অনেক সময় সেই
তৎপরতার ঘাটতি দেখা যায়। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, ট্রেনের
সময়সূচি বিপর্যয় কিংবা ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে কোনো দুর্ঘটনা বা যানবাহন বিকল হলে কয়েক ঘণ্টার যানজট
সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব পড়ে হাজারো যাত্রীর ওপর। তাই ঈদ-পরবর্তী যাত্রাকে গুরুত্ব
দিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং যানবাহন চলাচল তদারকির ওপর বিশেষ
নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বলা
বাহুল্য, এবারের ঈদুল আজহায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ছিল বলা
যাবে না। সরকারের বিভিন্ন প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তৎপরতা সত্ত্বেও
দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলগামী
পথে টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের ধীরগতি ও দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে
যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থেকে অনেকেই ঈদের
আনন্দের আগেই ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঈদযাত্রাকে
কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা।
টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা
এবং অপূরণীয় ক্ষতি। ফলে ঈদের আনন্দ অনেক পরিবারের জন্য শোকে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের
মতে, ছুটি শেষে দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছানোর তাড়নায় চালক ও যাত্রীরা অনেক সময়
ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার
পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে কঠোর
অবস্থান নেওয়া জরুরি।
শুধু
তাই নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মহাসড়কে নজরদারি বাড়াতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীকে আরও সক্রিয় থাকতে হবে এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণ
নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে এবং নিরাপদ ভ্রমণের
স্বার্থে নিয়ম মেনে চলতে হবে। অন্যদিকে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। নির্ধারিত টিকিট
ছাড়া ভ্রমণ, যানবাহনের ছাদে বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাতায়াত এবং তাড়াহুড়ো করে নিয়ম
ভঙ্গ করার প্রবণতা পরিহার করা প্রয়োজন। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে যাত্রীদের
সহযোগিতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদ মানুষের মিলন ও আনন্দের উৎসব। সেই আনন্দ যেন ফিরতি পথের যানজট ও দুর্ঘটনার কারণে ম্লান না হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও মানবিক সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার। আমরা মনে করি, ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার এই যাত্রা কোনো দুর্ভোগ বা দুর্ঘটনার কারণ না হয়ে স্বস্তি ও শৃঙ্খলার উদাহরণ হয়ে উঠুক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতের দায়িত্বশীলতা এবং যাত্রীদের সচেতন আচরণের সমন্বয়ে ঈদ-পরবর্তী ঢাকা ফেরা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবেÑ এমন প্রত্যাশাই সবার। আমরাও চাই, মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক হোক, কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তন হোক নতুন উদ্যম ও আশাবাদের বার্তা নিয়ে।
সম্পাদকীয়