× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬ ১২:০১ পিএম

রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বহুদিন ধরে আলোচিত রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বহুদিন ধরে আলোচিত রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬-এর অনুষ্ঠানে ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিক আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন। এতে নতুন করে প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-বঞ্চনা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব বিষয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে তিনি ‘পদবঞ্চনা, বৈষম্য, অপমান ও মানসিক নির্যাতনের’ শিকার হয়েছেন; কিন্তু ‘জাতীয়তাবাদী আদর্শ’ থেকে বিচ্যুত হননি।

রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বহুদিন ধরে আলোচিত রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক আনুগত্য বা মতাদর্শের প্রকাশ কতটা গ্রহণযোগ্যÑ সেই বিতর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির উপস্থিত ছিলেন। সেই মঞ্চেই রেজাউল করিম মল্লিক তার ২৯ বছরের চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ এই প্রথম পেলেন এবং দীর্ঘ অপমান-বঞ্চনার পর এই মুহূর্ত তার জীবনের ‘সুন্দরতম প্রাপ্তি’। বাংলাদেশের প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠেছে। এক সরকারের সময় যারা সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, অন্য সরকারের আমলে তাদের অনেকেই কোণঠাসা হয়েছেনÑ এমন অভিযোগ বহু পুরনো।

রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামো হিসেবে পরিচিত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হয়ে পড়ে, তাহলে পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন যদি দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ভেতরে অনাস্থা জন্ম নেয়।

ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকের বক্তব্যে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন স্পষ্ট। তিনি নিজেকে ‘বঞ্চিত’ ও ‘নির্যাতিত’ দাবি করলেও, একই সঙ্গে প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আনুগত্যের কথাও বলেছেন। এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসেÑ একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান কতটা গ্রহণযোগ্য?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ বাহিনীকে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব আইন প্রয়োগ করা, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করা নয়। ফলে কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয় বা আনুগত্যের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুলিশ প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে। বিরোধী দল দমন, রাজনৈতিক মামলার ব্যবহার, নির্বাচনকেন্দ্রিক ভূমিকা কিংবা মানবাধিকার প্রশ্নে অতীতের নানা সমালোচনার কারণে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন ডিআইজির বক্তব্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে অন্য দিকও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পদোন্নতি-বঞ্চনা বা প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগ যদি বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ একটি পেশাদার বাহিনীতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যায্যতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। রেজাউল করিম মল্লিকের বক্তব্য সেই জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বক্তৃতায় তিনি শৈশবের একটি স্মৃতিও তুলে ধরেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাদারীপুরের শিবচরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ধানের শীষের মালা পরিয়ে বরণ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। এই অংশটি নিছক আবেগের প্রকাশ হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান শুধু সাবেক রাষ্ট্রপতি নন; তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান প্রতীক। ফলে তার স্মৃতিচারণ ও ‘জাতীয়তাবাদী আদর্শ’ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার ঘোষণা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রকাশ করছেন, আবার কেউ অতীতের বঞ্চনার কথা সামনে আনছেন। রেজাউল করিম মল্লিকের বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনেÑ বাংলাদেশ কি সত্যিকার অর্থে একটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পেরেছে?

যদি কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, তাহলে তা যেমন উদ্বেগজনক; তেমনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনও একটি পেশাদার বাহিনীর জন্য অস্বস্তিকর সংকেত। দুই পরিস্থিতিই কাঙ্ক্ষিত নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি হওয়া উচিত পেশাদারত্ব, দক্ষতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ। রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের ভাগ্য বদলে যাবেÑ এমন ধারণা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগত স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে। পুলিশ সপ্তাহের মঞ্চে ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকের বক্তব্য তাই কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে ফের সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্ক সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি প্রশাসনিক সংস্কার ও পেশাদার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন কোনো ভাবনার জন্ম দেয়।


ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

সিনিয়র সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা