“রাস্তা আছে, কিন্তু চলার মতো না। স্কুল আছে, অফিস আছে, হাসপাতাল আছে; কিন্তু র্যাম্প নেই, লিফট নেই, উপযুক্ত টয়লেট নেই। ফলে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। ভেতরে ঢোকার অনুমতি থাকলেও সুযোগ থাকে না”।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সতত সালাম নেবেন। চিঠিটা লিখছি একটু অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। কারণ, এই দেশে ‘বিশেষ চাহিদা’ শব্দটা খুব সম্মানের সঙ্গে বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই সম্মানটা বেশিরভাগ সময় সিঁড়ির নিচেই পড়ে থাকে!
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মাটির একই কণায়; কিন্তু ভাগ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায়। কেউ দ্রুত হাঁটে, কেউ ধীরে; কেউ দেখে পৃথিবী চোখে, কেউ দেখে হৃদয়ে।
তবুও এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যেন তারা সমাজের মূল স্রোতের বাইরে লেখা একটি উপাখ্যান—যাদের গল্প শোনা হয়, কিন্তু পথ তৈরি করা হয় না।
মফস্বলের অবহেলিত অনেক ‘বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন’ শিশু কখনো স্কুলেই ঢুকতে পারে না। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পায় না বলে অনেক অভিভাবক সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান না। যারা যায়, তাদেরও বেশিরভাগকে পথেই থেমে যেতে হয়। ক্লাসে জায়গা নেই, শিক্ষক জানেন না কীভাবে শেখাবেন, আর সহপাঠীরা জানে না কীভাবে পাশে বসবে।
সহপাঠীরাও দোষের কিছু করে না। ওরা ছোট থেকেই শিখেছে যে, যে একটু আলাদা, তার পাশে বসলে নিজের ‘স্বাভাবিকতা’ কমে যেতে পারে। ‘সেফ ডিস্ট্যান্স’ বজায় রাখা জরুরি—এটা তো এখন সবারই জানা। সব মিলিয়ে দারুণ একটা সিস্টেম! এখানে কেউ কাউকে কষ্ট দেয় না, কারণ কাছাকাছি আসার সুযোগই দেওয়া হয় না।
দ্বিতীয় সমস্যা—রাস্তা আছে, কিন্তু চলার মতো না। স্কুল আছে, অফিস আছে, হাসপাতাল আছে; কিন্তু র্যাম্প নেই, লিফট নেই, উপযুক্ত টয়লেট নেই। ফলে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। ভেতরে ঢোকার অনুমতি থাকলেও সুযোগ থাকে না।
একজন মানুষের চলার পথ থেকে কাঁটা সরিয়ে দেওয়া সদকার সমান। তাহলে আমরা কেন এমন শহর গড়েছি যেখানে পথই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়?
তৃতীয় সমস্যা—স্বাস্থ্যসেবা আছে, কিন্তু নাগালের বাইরে। চিকিৎসা ব্যয় এত বেশি আর সহায়তা এত কম যে, অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজেরাই অর্থনৈতিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রে সিস্টেমটা নিষ্ঠুর না, বরং খুবই সুশৃঙ্খল! এখানে কেউ কাউকে ঠেলে ফেলে দেয় না, শুধু এমনভাবে দাঁড়িয়ে রাখে যাতে তারা নিজেরাই পড়ে যায়!
চতুর্থ সমস্যা—সমাজ। এই সমস্যা সবচেয়ে বড়, কিন্তু সবচেয়ে অদৃশ্য। অনেক মানুষ এখনো মনে করে প্রতিবন্ধী মানেই বোঝা। ফলে তারা স্কুলে যায় না, কাজে সুযোগ পায় না, এমনকি পরিবার থেকেও লুকিয়ে রাখা হয়।
পঞ্চম সমস্যা—কাজের সুযোগ নেই। যারা বড় হয়, তারা পড়ে থাকে; কারণ শিক্ষা কম, প্রশিক্ষণ কম আর চাকরির সুযোগ আরও কম। খুব অল্পসংখ্যক মানুষই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। আরও সমস্যা আছে, কিন্তু যেহেতু আমার চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে না, তাই মনকে সান্ত্বনা দিতেই লিখে যাচ্ছি।
এবার একটু অটিজম নিয়ে বলি। অটিজম কোনো সমস্যা না; সমস্যা হলো আমরা বুঝি না।
একটি অটিজম শিশু পৃথিবীকে দেখে অন্য চোখে; যেমন কেউ চাঁদকে দেখে নদীর পানিতে ভাঙা প্রতিচ্ছবির মতো। কিন্তু আমাদের ক্লাসরুমগুলো অনেক সময় একটিই সুর বাজায়—একই শব্দ, একই গতি, একই চাপ। ফলে যে শিশুটি ভিন্ন সুরে কথা বলে, সে ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়; যেন এক কবিতা, যেটি পড়ার আগেই বই বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে অটিজম আক্রান্ত অনেক শিশুই সঠিকভাবে শনাক্ত হয় না। গ্রামে তো অনেক পরিবার জানেই না এটা কী জিনিস। যারা শনাক্ত হয়, তাদের জন্য স্কুল কম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কম আর সহানুভূতি আরও কম!
তবে এটা সত্যি যে, বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের আমরা সম্মান করি। কখনো কখনো সম্মানটা এতটাই নীরব যে, তারা সেটা টেরই পায় না!
আমরা তাদের জন্য দরজা বানাই, কিন্তু দরজার সামনে সিঁড়ি রাখি। একটা ছোট্ট পরীক্ষা—যারা উঠতে পারবে, তারা ভেতরে ঢুকবে; যারা পারবে না, তারা বাইরে দাঁড়িয়ে বুঝে নেবে যে সমাজকাঠামো এখনো প্রস্তুত না। এটা কোনো বৈষম্য না, এটা ‘ন্যাচারাল ফিল্টারিং সিস্টেম’!
সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি শিক্ষার নয়, অবকাঠামোর নয়, বরং সমাজের। এখানে দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় দেয়ালের চেয়েও উঁচু হয়ে দাঁড়ায়। এখানে মানুষকে মাপা হয় হাঁটার গতিতে, বোঝার ক্ষমতায় বা কাজের দক্ষতায়।
যে সমস্যাগুলোর কথা আমি বোঝাতে চেয়েছি, কিন্তু হয়তো গুছিয়ে লিখতে পারিনি, সেই বিষয়গুলো আমি নিজে মোকাবিলা করেছি। এখনো বিরূপ পরিস্থিতির বিপরীতে বেঁচে আছি।
আল্লাহ তাআলা কোনো প্রাণের ওপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপান না। তাহলে আমরা কেন মানুষের পথকে ভারী করে দিই?
এই চিঠিটা কোনো অভিযোগ না, একটু মনে করিয়ে দেওয়া। দেশটা আমাদের সবার—যারা দৌড়াতে পারে তাদেরও, যারা ধীরে হাঁটে তাদেরও, আর যারা শুধু তাকিয়ে থাকে তাদেরও!
শেষে একটা ছোট অনুরোধ—কোনো একদিন কোনো এক স্কুলে হঠাৎ ঢুকে দেখবেন। হয়তো দেখবেন একটা বেঞ্চ খালি পড়ে আছে, কেউ বসেনি; কারণ বসার মতো পরিবেশটা আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি।
ইতি,
খালেদ মাহমুদ খান, একজন নাগরিক