× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবিক পুলিশিং: এক নতুন সামাজিক চুক্তির অন্বেষণ

কাজী জিয়া উদ্দীন

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬ ১৯:৪৭ পিএম

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬ ২০:০৩ পিএম

কাজী জিয়া উদ্দীন, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কাজী জিয়া উদ্দীন, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দুটি বৃহৎ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত এড়াতে তাদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য সৃষ্টি ও টিকিয়ে রাখা হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘বাফার রাষ্ট্র’। ইতিহাসে পোল্যান্ড দীর্ঘদিন জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যবর্তী একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

একইভাবে আফগানিস্তান একসময় রুশ সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক ছিল। নেপাল আজও ভারত ও চীনের মাঝখানে এক ধরনের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভূরাজনীতির এই ‘বাফার’ ধারণাটি যদি সমাজ ও রাষ্ট্রপরিচালনার বাস্তবতায় প্রয়োগ করি, তাহলে পুলিশ বাহিনীকে দেশের সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি মানবিক সেতুবন্ধনকারী শক্তি হিসেবে কল্পনা করা যায়। কারণ পুলিশ কেবল আইনের প্রয়োগকারী সংস্থা নয়; আধুনিক রাষ্ট্রে এটি সামাজিক আস্থা, ন্যায়বিচার ও নাগরিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার জনক স্যার রবার্ট পিল বলেছিলেন, পুলিশ ও জনগণ পরস্পরের বিপরীত কোনো সত্তা নয়; বরং একে অপরের সম্প্রসারিত রূপ। এই দর্শনই মানবিক পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি।

বিশ্বের অনেক উন্নত ও সুশাসিত দেশে পুলিশ আজ নিছক বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সমাজরক্ষক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। জাপানের ‘কোবান’ পুলিশিং ব্যবস্থা নাগরিক ও পুলিশের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে পুলিশের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনআস্থা এতটাই দৃঢ় যে তাদের পুলিশকে অনেকেই পরহিতৈষী ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেন।

এ ধরনের ব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, শিক্ষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক দায়িত্ববোধের দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে এটি বিকশিত হয়েছে। সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলোতে পুলিশের প্রতি নাগরিক আস্থার ভিত্তি হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বোধ। নিউজিল্যান্ড পুলিশের নীতিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয় অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তির চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধকে।

আমাদের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। যে দেশে উঠোন পেরোলেই সীমান্ত, সীমান্ত পেরোলেই ভিন্ন রাষ্ট্র, সেখানে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধ, মাদক, চোরাচালান, সাইবার জালিয়াতি, উগ্রবাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের বহুমাত্রিক চাপ প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই-নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না।

দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, জনজীবনের অন্যায়-অবিচারের প্রতি উদাসীনতার মূল্য একসময় পুরো সমাজকেই দিতে হয়। বাস্তবতাও তাই বলে। সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ মানুষের অভাব নেই; কিন্তু আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। ইংরেজ কবি ও সমালোচক ম্যাথিউ আর্নল্ডের ভাষায়, উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে অনেক, কিন্তু আলোকপ্রাপ্তি ঘটেনি ততটা।

বর্তমান বিশ্বে স্মার্ট পুলিশিং, অপরাধ পূর্বাভাসভিত্তিক পুলিশিং, ডিজিটাল নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর আইন প্রয়োগব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। দুবাই পুলিশ ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবা চালু করেছে। এস্তোনিয়া ডিজিটাল শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া সামাজিক সংহতি ও প্রযুক্তিনির্ভর জননিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিক আস্থার একটি কার্যকর মডেল গড়ে তুলেছে।

তবে প্রযুক্তি একা কখনো মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। প্রযুক্তিকে মানবিকতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত না করলে তা কেবল নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হয়।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক-কোথাও অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ন্যায়বিচার তাই কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি একটি সামষ্টিক দায়বদ্ধতা।

আমরা প্রায়ই বাহ্যিক চাকচিক্য, কাগুজে সাফল্য ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন দেখে মুগ্ধ হই। অথচ প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে কর্মে, চরিত্রে ও দায়িত্ববোধে। আমরা যা করি, সেটিই আমাদের প্রকৃত পরিচয়। প্রশংসাপত্র কিংবা অলংকৃত বক্তৃতা কাউকে মহৎ করে তোলে না; সত্যিকার মূল্যায়ন নির্ভর করে কাজের ওপর।

আফ্রিকান সাহিত্যিক ও নোবেলজয়ী চিন্তাবিদ উওলে সোয়িঙ্কা বলেছিলেন, বাঘকে নিজেকে বাঘ প্রমাণ করার জন্য ঘোষণা দিতে হয় না; তার স্বভাব ও শক্তিই তার পরিচয় বহন করে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কর্মস্পৃহা, দক্ষতা, উদ্যোগ ও নৈতিকতাই প্রকৃত পরিচয়ের মানদণ্ড।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার মূল শক্তি শুধু অর্থনীতি নয়; বরং শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান। পুলিশ সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। যদি পুলিশ জনগণের আস্থা হারায়, তবে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আজ প্রয়োজন এমন এক মানবিক পুলিশিং দর্শনের, যেখানে পুলিশ হবে ভীতির নয়, আস্থার প্রতীক; হবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে থানার দরজা দরিদ্র মানুষের কাছেও সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে; যেখানে আইন ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-নিরুপায়-সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে; যেখানে একজন পুলিশ সদস্য নিজেকে জনগণের প্রভু নয়, জনগণের সেবক হিসেবে বিবেচনা করবেন।

কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে না কেবল অস্ত্রের শক্তি বা ভয়ের সংস্কৃতির ওপর; রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণমূলক সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে।

আসুন, আমরা সবাই-রাষ্ট্র, সমাজ, নাগরিক ও পুলিশ নিজ নিজ অবস্থান থেকে আত্মসমালোচনা করি। একটু ভাবি, একটু বুঝি। তারপর যদি বিবেক সায় দেয়, তবে একটি নতুন মানবিক যাত্রা শুরু করি।


শুভস্য শীঘ্রম

কাজী জিয়া উদ্দীন, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা