× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কিচেন ক্যাবিনেট সমাচার: যে কিচেনে কেহই রান্না করে নাই!

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬ ১৭:২৪ পিএম

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬ ২১:২৯ পিএম

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিধানে যে শব্দবন্ধটি সর্বাধিক রহস্যময় মর্যাদা লাভ করিয়াছে, তাহার নাম—‘কিচেন ক্যাবিনেট’। ছবি: পিআইডি

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিধানে যে শব্দবন্ধটি সর্বাধিক রহস্যময় মর্যাদা লাভ করিয়াছে, তাহার নাম—‘কিচেন ক্যাবিনেট’। ছবি: পিআইডি

রাজনীতির ইতিহাসে অনেক বিচিত্র বস্তু দেখা গিয়াছে। কোথাও গোপন বৈঠক, কোথাও ছায়া সরকার, কোথাও অদৃশ্য উপদেষ্টা পরিষদ। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিধানে যে শব্দবন্ধটি সর্বাধিক রহস্যময় মর্যাদা লাভ করিয়াছে, তাহার নাম—‘কিচেন ক্যাবিনেট’।

ইহা এমন এক আশ্চর্য কিচেন, যাহার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানিত, সংবাদমাধ্যম আলোচনা করিত, রাজনৈতিক মহল ফিসফাস করিত, আমলারা সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিত, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহও নাকি সেখান হইতেই উৎপন্ন হইত; কিন্তু আজ যখন সময়ের স্রোত খানিক ঘুরিয়া গিয়াছে, তখন দেখা যাইতেছে—সেই কিচেনে কেহই উপস্থিত ছিলেন না!

ঘটনাটি অনেকটা গ্রামের বিয়েবাড়ির খাসির মাংসের পাতিলের ন্যায়। খাওয়ার সময় হাজার লোক হাজির, কিন্তু বিল মেটাইবার সময় জিজ্ঞাসা করিলে দেখা যায়—“আমি তো খাই নাই!”

প্রথমেই আসুন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মহাশয়ের কথায়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করিলেন—তিনি কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য ছিলেন না। অথচ কে না জানে—সকল নাটের গুরু ছিলেন তিনি!

দেশবাসী ভাবিল, আচ্ছা, তাহা হইতেও পারে। সকল কিচেনে তো আর সকলের প্রবেশাধিকার থাকে না। আইন উপদেষ্টার কাজ আইন দেখা; কিচেন দেখা নহে।

কিন্তু কিছুদিন পরেই আবির্ভূত হইলেন তাহারই রাজনৈতিক শিষ্য, ছোট আসিফ—অর্থাৎ আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। তিনি বলিলেন, “আমিও কিচেনে ছিলাম না।”

এখানে জনসাধারণ খানিকটা বিস্মিত হইল। কারণ গুরু নাই, শিষ্যও নাই। কিচেনে তবে রান্না করিত কে?

ইহার পর ময়দানে নামিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় জানাইলেন, তাহাকে নাকি সেখানে রাখাই হয় নাই।

এই বক্তব্যে রহস্য আরও গভীর হইল। কারণ তিনি বলিলেন না যে তিনি যান নাই; বরং বলিলেন, তাহাকে রাখা হয় নাই। অর্থাৎ কিচেন ছিল, কিন্তু সেখানে তাহার জন্য চুলার পাশে কোনো চেয়ার সংরক্ষিত ছিল না!

এরপর আসিলেন সাবেক মৎস্য উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বিষয়টিকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করিলেন।

তাহার ভাষ্যমতে, তিনি শুরু হইতেই আমেরিকা-বিরোধী ছিলেন। অতএব তাহাকে ঐ কিচেনে রাখা হয় নাই।

অর্থাৎ ইহা কেবল রান্নাঘর ছিল না; ইহা ছিল মতাদর্শ যাচাইয়ের রান্নাঘর। যেখানে প্রবেশের পূর্বে হয়তো জিজ্ঞাসা করা হইত—“আপনি আমেরিকা সম্পর্কে কী ভাবেন?”

এরপর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন সাহেবের পালা। তিনি প্রশাসন সংক্রান্ত কমিটির প্রধান ছিলেন। সচিব নিয়োগ লইয়া কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও তাহার দিকে নির্দেশ করিতেছে। কিন্তু তিনি বলিলেন—তিনি ঐ পাওয়ারফুল কিচেনের অংশ ছিলেন না।

এইখানে জনগণ কিছুটা হতবুদ্ধি হইল। কারণ কিচেনে না থাকিলেও রান্না করা খাবার যাহার টেবিলে পৌঁছাইত, এবং যিনি সেই খাবার পরিবেশন করিতেন, তিনি যদি বলেন— ‘আমি রান্নাঘরের লোক নই’—তাহা হইলে সাধারণ মানুষ আর কাহাকে বিশ্বাস করিবে?

দেশবাসীর অনেকেই বলিতে আরম্ভ করিলেন, “কিচেনে না থাকিলেও মেনু সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট অবগত ছিলেন বলিয়া মনে হয়!”

পরিবেশ উপদেষ্টা আইনজীবী সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান মহোদয়া আরও এক ধাপ অগ্রসর হইলেন।

তিনি বলিলেন, “এমন কোনো কিচেন ক্যাবিনেট ছিল বলিয়াই আমার জানা নাই।”

এই বক্তব্য শুনিয়া কিচেন ক্যাবিনেট রহস্য প্রায় অতিপ্রাকৃত পর্যায়ে উন্নীত হইল। কারণ অন্যরা বলিতেছেন-কিচেন ছিল, কিন্তু তাহারা সেখানে ছিলেন না। আর তিনি বলিতেছেন, কিচেনই ছিল না!

অর্থাৎ পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইল যে, একদল বলিতেছে ভূত ছিল কিন্তু আমরা দেখি নাই; আরেকদল বলিতেছে ভূতই ছিল না।

সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অবশ্য কিছুটা কূটনৈতিক ভঙ্গি অবলম্বন করিলেন।

তিনি স্বীকার করিলেন যে, এমন একটি কেবিনেটের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি জানিতেন। তবে সদস্য ছিলেন না।

কূটনীতিকদের ভাষা এমনই হয়। তাহারা সাধারণত দরজা খোলা রাখিয়া বাহির হইয়া যান।

অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও বলিলেন, “তিনি এই গোষ্ঠীর অংশ ছিলেন না।”

আরেক সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আগেই পদত্যাগ করিয়া রাজনৈতিক অভিযাত্রায় যাত্রা করিয়াছেন। ফলে তাহাকে আপাতত এই কিচেন বিতর্কের বাহিরে রাখা হইতেছে।

এখন সমস্যাটি হইল, এই ধারাবাহিক অস্বীকারের পর একটি মৌলিক প্রশ্ন অবধারিতভাবে উপস্থিত হইয়াছে।

যদি আসিফ না থাকেন,

ছোট আসিফ না থাকেন,

সাখাওয়াত না থাকেন,

ফরিদা না থাকেন,

সালেহউদ্দিন না থাকেন,

রেজওয়ানা কিচেনের অস্তিত্বই না জানেন,

তৌহিদ জানেন কিন্তু থাকেন না,

মাহফুজও থাকেন না—তাহা হইলে কিচেনে ছিল কে? কড়াই নাড়িত কে? মশলা দিত কে? মেনু বানাইত কে? আর সেই রান্না করা নীতিনির্ধারণী খিচুড়ি দেশবাসীর প্লেটে পরিবেশন করিত কে? রাজনীতির ছাত্ররা ইহাকে ইতোমধ্যে ‘অদৃশ্য রাঁধুনি তত্ত্ব’ বলিয়া আখ্যা দিতে আরম্ভ করিয়াছে।

এমনও হইতে পারে, একদিন ইতিহাসের গবেষকগণ আবিষ্কার করিবেন—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কিচেন ছিল, যেখানে রান্না হইত; কিন্তু রাঁধুনি ছিল না। সিদ্ধান্ত হইত; কিন্তু সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ছিল না। নির্দেশ আসিত; কিন্তু নির্দেশদাতা ছিল না। দায় ছিল; কিন্তু দায়ী ছিল না কেহ।

অবশ্য এই পর্যায়ে আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উত্থাপিত হইতেছে। যদি এই অস্বীকার-উৎসব আরও কিছুদিন চলিতে থাকে, তবে একদিন কি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বলিবেন—“কিচেন ক্যাবিনেট? আমি তো সে কিচেনে যাইই নাই!”


তাহা হইলে দৃশ্যটি আরও মনোরম হইবে। কারণ তখন দেখা যাইবে, যে সরকারের আমলে কিচেন ক্যাবিনেটের সবচেয়ে বেশি আলোচনা হইয়াছে, সেই সরকারের কোনো সদস্যই তাহার সদস্য ছিলেন না।

অর্থাৎ কিচেন ছিল, কিন্তু কেহ ছিল না। সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ছিল না।

ক্ষমতা ছিল, কিন্তু ক্ষমতাধর ছিল না।

দায় ছিল, কিন্তু দায়ী ছিল না।

শেষ পর্যন্ত এই ঘটনা কেবল একটি রাজনৈতিক রসিকতা নহে। ইহা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুতর প্রশ্নও উত্থাপন করে। কারণ রাষ্ট্রে সিদ্ধান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সিদ্ধান্তের মালিকানাও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নীতি সফল হইলে তাহার কৃতিত্ব গ্রহণ করিবার লোকের অভাব হয় না; কিন্তু নীতি বিতর্কিত হইলে যদি সকলে একযোগে অদৃশ্য হইয়া যান, তবে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগিবেই।

অতএব সময়ের দাবি একটিই—কিচেন থাকিলে রাঁধুনির নাম বলিতে হইবে। কারণ ইতিহাসের পাতায় ‘অজ্ঞাতনামা বাবুর্চি’ লিখিয়া রাষ্ট্র পরিচালনা চলে না।

আর যদি সত্যই কেহ সেখানে না থাকিয়া থাকেন, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইহাই সম্ভবত প্রথম কিচেন; যেখানে রান্না হইয়াছে, কিন্তু রাঁধুনি পাওয়া যায় নাই!


লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা