× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুশাসন

স্বচ্ছতা, উদ্ভাবন ও বাংলাদেশের আগামী

কাজী জিয়া উদ্দিন

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬ ২১:০০ পিএম

আপডেট : ২৯ মে ২০২৬ ২১:০৯ পিএম

কাজী জিয়া উদ্দিন

কাজী জিয়া উদ্দিন

মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ক্ষমতার সুষ্ঠু প্রয়োগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যেখানে শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, নাগরিক মর্যাদা বেড়েছে এবং সমাজে স্থিতি এসেছে। আর যেখানে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতা প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে উন্নয়নের অট্টালিকাও বালুর বাঁধে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই কফি আনান বলেছিলেন, ‘সুশাসনই দারিদ্র্য দূরীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি।’

হেনরি ডেভিড থোরো তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন-‘সেই সরকারই উত্তম, যে সরকার সবচেয়ে কম শাসন করে।’ এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং দায়িত্বশীল, মানবিক ও জনমুখী প্রশাসনে নিহিত। অন্যদিকে লুই ব্র্যান্ডাইস যথার্থই বলেছিলেন-‘সূর্যের আলোই সবচেয়ে বড় জীবাণুনাশক।’ অর্থাৎ স্বচ্ছতা এমন এক শক্তি, যা দুর্নীতির অন্ধকারকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

সুশাসন কেবল প্রশাসনিক পরিভাষা নয়; এটি রাষ্ট্রের আত্মা। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিকরা ভয় নয়, আস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের দিকে তাকায়।

‘শাসন’ শব্দটির ধারণাগত উৎস গ্রিক শব্দ কাইবারনান, যার অর্থ ‘জাহাজ পরিচালনা করা’। রাষ্ট্রও এক অর্থে বিশাল এক জাহাজ; আর সরকার তার নাবিক। দক্ষ নাবিক যেমন ঝড়ের মধ্যেও দিক হারায় না, তেমনি সুশাসিত রাষ্ট্রও সংকটের ভেতর থেকে সম্ভাবনার পথ খুঁজে নেয়।

সুশাসনের প্রধান ভিত্তিগুলো হলো-স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন, দক্ষতা ও উদ্ভাবন।

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক বহুবার বলেছে, টেকসই উন্নয়ন মূলত সুশাসনের ওপর নির্ভরশীল। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। কার্ল ক্রাউসের ভাষায়, ‘দুর্নীতি একটি সমাজের সামগ্রিক নৈতিকতাকে বিপন্ন করে।’

একসময় সম্পদহীন ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বে সুশাসনের এক অনন্য প্রতীক। লি কুয়ান ইউ কঠোর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, মেধাভিত্তিক প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বদলে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন-‘কোনো জাতি আকস্মিকভাবে সমৃদ্ধ হয় না।’

সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণের মেধা। সেখানে নাগরিকসেবা ডিজিটাল, প্রশাসন দ্রুত, আইন নিরপেক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। তাদের সাফল্যের মূলভিত্তি- সময়ানুবর্তিতা, জাতীয় দায়িত্ববোধ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও সামাজিক শৃঙ্খলা।

জাপান দেখিয়েছে, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি মানসিকতারও পরিবর্তন। জিম রোন যথার্থই বলেছিলেন-‘শৃঙ্খলাই লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যকার সেতুবন্ধন।’

সীমিত ভূখণ্ড ও সীমিত সম্পদ নিয়েও হংকং ব্যবসাবান্ধব নীতি, দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে, সুশাসন থাকলে সম্পদের সীমাবদ্ধতাও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ কোরিয়া আজ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিশ্বনেতা। স্যামসাং, হুন্দাই কিংবা এলজি শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের সফল সমন্বয়ের প্রতীক।

স্টিভ জবস বলেছিলেন-'উদ্ভাবনই নেতা ও অনুসারীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।' দক্ষিণ কোরিয়া সেই সত্যকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বিশ্বে কল্যাণরাষ্ট্র ও স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এসব দেশে-করব্যবস্থা স্বচ্ছ, সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার।নারী-পুরুষ সমতা উচ্চপর্যায়ে ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন।

তারা দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যদি নাগরিককে মর্যাদা দেয়, নাগরিকও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। রাষ্ট্র ও জনগণের এই পারস্পরিক আস্থা উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক।

শিল্পবিপ্লব, নবজাগরণ ও আলোকায়নের মধ্য দিয়ে ইউরোপ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত নির্মাণ করেছে। তারা উপলব্ধি করেছে- জ্ঞান, বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির বিকল্প নেই।

ভলতেয়ারের ভাষায়, ‘একজন মানুষকে তার উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন দিয়ে বিচার করো।’ অর্থাৎ যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়।

আফ্রিকার সব দেশ দুর্বল শাসনের উদাহরণ নয়। বরং কিছু রাষ্ট্র অনুকরণীয় অগ্রগতি দেখিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে তুলনামূলক স্বচ্ছ প্রশাসন, গণতন্ত্র ও খনিজসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বতসোয়ানা আফ্রিকার সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ভয়াবহ গণহত্যার পরও রুয়ান্ডা প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনায় বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি যেন নেলসন ম্যান্ডেলার সেই অমর বাণীর বাস্তব প্রতিফলন- ‘অসম্ভব বলেই মনে হয়, যতক্ষণ না তা সম্পন্ন হয়।’

পর্যটন, শিক্ষা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা দেখিয়ে মরিশাস আফ্রিকার মধ্যে স্থিতিশীল অর্থনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে সুশাসন আর কেবল ফাইল চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন প্রয়োজন-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট শাসনব্যবস্থা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা, ই-গভর্ন্যান্স ও নাগরিককেন্দ্রিক সেবা।

বিশ্ব এখন 'শ্রেষ্ঠ অনুশীলন' অনুসরণ করে। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রের যে মডেল সফল, অন্য রাষ্ট্র তা গ্রহণ করছে। যেমন- এস্তোনিয়ার ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা, সিঙ্গাপুরের নগর পরিকল্পনা, ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ প্রশাসনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি দুর্নীতি কমাতে, সেবা দ্রুত করতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও তথ্যনির্ভর করতে সহায়তা করছে।

বিশ্ববাসী জানেন, বাংলাদেশ সম্ভাবনার এক অদম্য ভূখণ্ড। তরুণ জনগোষ্ঠী, কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি আমাদের সামনে বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

প্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন।রাজনৈতিক সহনশীলতা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ। প্রযুক্তিনির্ভর জনসেবার পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

রাষ্ট্রকে এমন হতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য প্রভাবশালীর দরজায় নয়, আইনের দরজায় কড়া নাড়ে। রাষ্ট্র যদি কোনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়, তবে জনগণ অধিকার ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এ প্রসঙ্গে একটি প্রবাদ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক- ‘যেখানে শাসন দুর্বল, সেখানে শক্তিশালীরাই নিয়ম লেখে এবং দুর্বলরা তার মূল্য দেয়।’

সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্র টিকে থাকার পূর্বশর্ত। আজকের বিশ্বে শুধু শক্তিশালী সেনাবাহিনী নয়, বরং দক্ষ প্রশাসন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করে।

সূর্যের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি স্বচ্ছতা দুর্নীতিকে উন্মোচিত করে। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে সম্মান দেয়, আইন যদি সবার জন্য সমান হয় এবং নেতৃত্ব যদি দূরদর্শী হয়- তবে একটি দেশ অনায়াসে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতাকে পরাজিত করতে পারে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের স্মরণ রাখতে হবে- জনগণই প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। জনগণের আস্থা ও কল্যাণই একটি রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী স্মারক।

বাংলাদেশও পারে- যদি আমরা সুশাসনকে কেবল বক্তৃতার শব্দ না বানিয়ে জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে পারি। তখনই হয়তো একদিন বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ শুধু জনসংখ্যার দেশ নয়, বরং 'সুশাসনের এক অনন্য মডেল' হিসেবেও উচ্চারিত হবে।

লেখক: কাজী জিয়া উদ্দিন

অবসরপ্রাপ্ত উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি)।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা