× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যমুনার রিসেপশন কাণ্ড: সংবর্ধনা গেল কোথায়?

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬ ১৯:২৬ পিএম

আপডেট : ২৯ মে ২০২৬ ২১:৩৬ পিএম

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব। ফাইল ছবি

ঈদ আসে, ঈদ যায়; কিন্তু যমুনার ঈদ-সংবর্ধনা দীর্ঘকাল ধরে এক অলিখিত রাষ্ট্রীয় প্রথায় পরিণত হয়েছিল। কূটনীতিক, মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিক, দলীয় কর্মী, বিশিষ্টজন—সবাই সেখানে সমবেত হতেন। কেউ শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন, কেউ ছবি তুলতেন, কেউ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনার হিসাব কষতেন, আবার কেউ কেবল 'স্যারের সঙ্গে একটু দেখা' হওয়ার আশায় দূর জেলা থেকে ধুলোবালি মেখে রাজধানীতে উপস্থিত হতেন। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি ঈদের অনুষ্ঠান ছিল না; বরং ক্ষমতার করিডোরে সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনর্মিলনীর এক মহাউৎসব


সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে এই রেওয়াজ নিয়মিত ছিল। পরে শেখ হাসিনাও তা অনুসরণ করেছেন। এমনকি অন্তর্বর্তী আমলেও অনুষ্ঠান হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সরকারে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে ঈদুল ফিতরে সেই রিসেপশনের আয়োজন করেছিলেন। ফলে জনগণের ধারণা জন্মেছিল—'যমুনার দরবার' আবার পুরোদমে ফিরে আসছে।


কিন্তু হায়! ঈদুল আজহা এলো, কোরবানি হলো, মানুষ পশু কোরবানি দিল, সেমাই খেলো, গ্রাম থেকে শহরে ফেরার প্রস্তুতি নিল—কিন্তু যমুনার দরবার আর বসলো না এবার! সম্বর্ধনা বাতিল। দরজা নিস্তব্ধ। লনে বাতি জ্বললো না। কূটনীতিকদের গাড়ির সারি দেখা গেল না। কর্মীদের সাদা পাঞ্জাবি আর মোবাইল ক্যামেরার ঢলও অনুপস্থিত।


অতঃপর প্রশ্ন জাগলো—কেন?

প্রথমত, কেউ কেউ বলছেন—'অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত।' এটি শুনে জাতি খানিকক্ষণ চিন্তায় নিমগ্ন হলো বটে। কিন্তু তখনই আরেকজন স্মরণ করিয়ে দিলেন—'তাহলে বঙ্গভবনের অনুষ্ঠান বাতিল হলো না কেন?' কারণ রাষ্ট্রের খরচের বেলায় যদি এতই মিতব্যয়িতা শুরু হয়, তবে তা তো সর্বত্র সমভাবে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। কেবল যমুনার বেলায় কৃচ্ছতা আর বঙ্গভবনের বেলায় আতিথেয়তা—এটি বুঝতে সাধারণ জনগণের খানিকটা বেগ পাওয়ারই কথা।


দ্বিতীয়ত, আরেকটি ব্যাখ্যাও বাতাসে উড়ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাকি একটু ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। তিনি প্রচলিত ধারায় হাঁটতে পছন্দ করেন না। সুতরাং সিভিলিয়ানদের ঈদ-সম্ভাষণ বাদ দিয়ে তিনি সরাসরি সেনাসদস্যদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে গেলেন। নিঃসন্দেহে এটি অভিনব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কূটনীতিক, কেবিনেট সদস্য, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সিভিল প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট নাগরিক এবং হাজার হাজার দলীয় কর্মীকে বাদ দিয়ে একটি সেনা ইউনিটে যাওয়া কি প্রকৃত অর্থেই উত্তম বিকল্প? নাকি এটি নতুন যুগের 'সংক্ষিপ্ত গণসংযোগ'?


তবে রাজনৈতিক মহলের অধিকাংশের ধারণা অন্যত্র। তাঁরা মনে করেন, মূল রহস্য লুকিয়ে আছে তিন মাস আগেকার ঈদুল ফিতরের সেই বহুচর্চিত রিসেপশন কাণ্ডে।


স্মরণ করা যাক—সেই অনুষ্ঠানে কী ঘটেছিল! নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ঈদ-সম্বর্ধনা বলে কথা। জনসমুদ্র উপচে পড়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, অতিথিদের আপ্যায়নের পরিবর্তে অনেকে কার্যত 'বেঁচে ফেরার সংগ্রাম' করেছিলেন। সিনিয়র-জুনিয়র নেতাকর্মী, আমন্ত্রিত বিশিষ্টজন—সকলেই ধাক্কাধাক্কি, পদদলন ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছিলেন। এমনকি বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ ও অসুস্থ নেতারাও ঠেলাঠেলির হাত থেকে রেহাই পাননি। কেউ প্রবেশ করতে পারেননি, কেউ বের হতে পারেননি, আর কেউ ঢুকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পাননি।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিগণ তখন এমন ভাব করছিলেন যেন এটি কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং হঠাৎ আয়োজিত ডিসকাউন্ট সেলের উদ্বোধন। যাদের জীবনে এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা নেই—এমনকি টেলিভিশনেও সম্ভবত ঠিকমতো দেখেননি—তারাই নাকি চেয়ার দখল করে বসেছিলেন। ফলতঃ অতিথি আপ্যায়নের পরিবর্তে অতিথিরাই একে অপরকে ঠেলে স্থান উদ্ধার করতে বাধ্য হন। হাজার হাজার মানুষের সামনে প্রধানমন্ত্রীর সম্মান কার্যত 'হেড ডাউন' অবস্থায় পতিত হয়।

সুতরাং প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান ঈদে অনুষ্ঠান বাতিলের পেছনে কি সেই দুঃসহ স্মৃতির আতঙ্কই কাজ করেছে? প্রধানমন্ত্রী কি ভেবেছেন—'যে পথে একবার গিয়েছি, সে পথে আর নয়'? অর্থাৎ, আরেকবার বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা দেখে তিনি পুরো অনুষ্ঠানই বাতিল করে দিলেন?


এটি যেন অনেকটা সেই প্রবাদবাক্যের ন্যায়—'চোরের উপর রাগ করে ভাত না খেয়ে শয়ন।' ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ছিল আয়োজকদের; কিন্তু শাস্তি পেল পুরো রাজনৈতিক সমাজ, কূটনৈতিক মহল, দলীয় কর্মী এবং ঈদের সামাজিক সংস্কৃতি।


অবশ্য রাজনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি বার্তা থাকে। যমুনার দরবার না বসা মানে কেবল একটি অনুষ্ঠান বাতিল নয়; এটি ক্ষমতার ভাষা, দূরত্বের ইঙ্গিত, কিংবা নতুন রাজনৈতিক স্টাইলেরও বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। এখন দেখার বিষয়—এটি সাময়িক বিরতি, নাকি ভবিষ্যতের নতুন রেওয়াজের সূচনা।


তবে একটি কথা নিশ্চিত—যমুনার লনের নীরবতা এই ঈদে রাজনৈতিক অঙ্গনে যত আলোচনা জন্ম দিয়েছে, সম্ভবত সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হলেও এত আলোচনা হতো না।


লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা