আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি শুধু একজন কবি নন, এক জাগরণের নাম। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক উজ্জীবক সত্তা। যিনি অন্যায়-অবিচার, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে তার কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তার কবিতায় যেমন দ্রোহের বজ্রনিনাদ শোনা যায়; তেমনি প্রেম, সাম্য ও মানবতার কোমল সুরও অনুরণিত হয়। তার কবিতা ও গানে অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যে শাণিত প্রতিবাদ রয়েছে; তা আজও প্রাসঙ্গিক এবং অনিবার্য।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১১ জ্যৈষ্ঠ
১৩০৬ বঙ্গাব্দ অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। বাবার
নাম কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহেদা খাতুন। দরিদ্র ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বাবার
অকালমৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি শিশু বয়সেই দোকানে কর্মচারী, মক্তবে
শিক্ষকতা, হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেম ও মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তবে কেবল নিজের
দুঃখ নিয়ে নয়, তিনি সব সময় ভাবতেন মানুষের দুঃখ-ক্লেশ, দৈন্যদশা ঘোচানোর কথা। বাঙালির
আবেগ-অনুভূতিতে জড়িয়ে থাকা নজরুল বেঁচেছিলেন ৭৭ বছর। জন্মের পর থেকে মাত্র ৪৩ বছর
বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন। তার সাহিত্যিক জীবন ছিল মাত্র ২৪ বছর।
তারপরও বাঙালির জীবনে তার প্রভাব দিগন্তবিস্তারি। তার ‘সাহিত্যকর্ম’ পরাধীন ভারতবর্ষে
সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।
দেশভাগের পর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে স্বাধিকার আন্দোলন, সর্বোপরি
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সৃষ্ট গান-কবিতা আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
তার বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ শুধু একটি
সাহিত্যকর্ম নয়, চিরন্তন প্রতিবাদের প্রতীক। কবিতায় তার ‘আমি চিরবিদ্রোহী বীর’-উচ্চারণ
যুগে যুগে নিপীড়িত মানুষের সাহস জুগিয়েছে। তার লেখনী ছিল ধর্মান্ধতা ও বৈষম্যের
বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মানুষ’। সে কথাই
লিখে গেছেন মানুষ কবিতায়Ñ ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু
মহীয়ান।’ তবে প্রেম ও মানবতার কবি হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। তার প্রেমের কবিতা ও
গান বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ভান্ডারকে করেছে পরিপূর্ণ। একই সঙ্গে ইসলামী সংগীত,
শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি কিংবা দেশাত্মবোধক গানে তিনি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার
পরিচয় দিয়েছেন, তা আজকের বিভক্ত বিশ্বে আরও বেশি মূল্যবান। তিনি হিন্দু-মুসলিম
সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিলেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল
সাহিত্য ও সংগীতে যেমন ছিলেন জাগ্রত, তেমনি সাংবাদিকতা ও পত্রিকার সম্পাদনায়ও তিনি
ছিলেন অগ্রগামী। সমকালীন রাজনীতি সচেতনতা থেকেই তিনি সাংবাদিকতায় এসেছিলেন, যা তার
সম্পাদকীয়তে প্রকাশ পেয়েছে। অবিভক্ত বাংলার বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা তিনি
সম্পাদনা করেছেন। তার সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’ (পরবর্তীকালে
গণবাণী নামে প্রকাশিত) পত্রিকাগুলো বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান
অধিকার করে আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্রও হয়ে উঠেছিল তার সম্পাদিত
পত্রিকাগুলো। সাংবাদিক হিসেবে চাকরি করেছেন সেবক এবং সওগাত-এ। মানুষের অধিকার
আদায়ের আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তিনি সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
নজরুল ছিলেন শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের
বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। যে কারণে তার সাহিত্যকর্মের গভীরতা, বৈচিত্র্য ও মানবিক আবেদন
থাকা সত্ত্বেও তিনি তার সমকাল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হননি। সাহিত্য-বিশ্লেষকরা
মনে করেন, নজরুলের বিশাল রচনাভান্ডার যথাসময়ে আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোতে, বিশেষ করে
ইংরেজিতে, পর্যাপ্তভাবে অনূদিত না হওয়ায় সেগুলো বিশ্বসাহিত্যের মূলধারায় পৌঁছানোর
সুযোগ পায়নি। তার কবিতা, গান ও প্রবন্ধে যে বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও প্রেমের
শক্তিশালী বার্তা রয়েছে; তা বিশ্বমানবতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভাষাগত
সীমাবদ্ধতায় তা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছেনি। তবে পুরস্কার না
পাওয়ায় নজরুলের সাহিত্যিক মর্যাদা এতটুকু কমে না। কারণ তার সৃষ্টির শক্তি এতটাই
প্রবল ও প্রভাবিস্তারি যে, কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত।
সমাজে যখন বিভেদ,
সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা ক্রমশ বাড়ছে, তখন নজরুলের আদর্শ আমাদের নতুন করে পথ দেখায়।
তার সাহিত্য আমাদের শেখায়Ñ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, মানুষকে ভালোবাসতে।
তার চেতনা তরুণ প্রজন্মকে সাহসী, মানবিক ও মুক্তচিন্তার মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় নজরুলকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ
রাখি। জন্ম বা মৃত্যুদিবস এলেই কিছু আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক
মাধ্যমে স্মরণের মধ্যেই যেন দায় শেষ হয়ে যায়। এখন প্রয়োজন তার সাহিত্য ও দর্শনের
গভীরে প্রবেশ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার কবিতা-গান,
গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ বিদেশি ভাষায় অনুবাদ ও প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বময়
ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী ও দ্রোহের চেতনাকে বর্তমান সময়ের বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগাতে হবে। তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে সেরা উপায় হলোÑ তার আদর্শকে ধারণ করা এবং বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে কাজ করা। মনে রাখতে হবেÑ নজরুল কেবল অতীতের কবিই নন, তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও প্রেরণা।
সম্পাদকীয়