× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ত্যাগের আদর্শ ও নজরুলের বাণী

নূরুদ্দীন দরজী

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

ত্যাগের আদর্শ ও নজরুলের বাণী

মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘটনা আর কাহিনীগুলোতে রয়েছে ত্যাগের মহিমা। বিশ্বাস ও সত্যের দিপ্তিতে প্রিয় বস্তুকে বিসর্জন দেওয়ার অনুভূতি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবিদার।

আরও পড়ুন: কোরবানির শিক্ষা

কোরবানির ত্যাগ ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও মানবিকতার প্রতীক। ‘কোরবান’, আরবি শব্দ হলেও উর্দু, হিন্দি, ফার্সি এমনকি আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়ও বহুল প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার মানসিকতার নজির স্থাপন করে গেছেন। সেই দৃষ্টান্ত কোরবানির সকল ইতিহাস ও ত্যাগের ওপরে স্থানলাভ করছে। অন্যান্য কোরবানি বা ত্যাগের উজ্জ্বলতা আজ অবধি ওই ঘটনাকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে বলে বিবেচিত হয়নি।

কোরবানি বা ত্যাগের আরও বহুবিধ উপাখ্যান রয়েছে পৃথিবীতে। হিন্দুদের অথর্ব বেদে বলা হয়েছে, আদিকালে ব্রহ্মার দুই পুত্র ছিল। তাদের একজন অথর্ব এবং অপর নাম অঙ্গিরা। ব্রহ্মা ঐশী আদেশ মোতাবেক জ্যেষ্ঠ পুত্র অথর্বকে বলি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাদের শাস্ত্রে এটিকে পুরুষ মেধযজ্ঞ বলা হয়। আর ব্রহ্মার ওই ঘটনা থেকেই ধারাবাহিকভাবে অথর্বের জায়গায় পশু বলি দেওয়া শুরু হয়ে যায়। ব্রহ্মার এমন কর্ম পরবর্তীতে অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন নামে আত্মত্যাগের গৌরব বলে সাধন করে আসছে। সেই পাঁচ হাজার বছর আগে শিনারের বর্তমান ইরাকের বাদশাহ ছিল নমরুদ। নমরুদের সময় দেব-দেবীদের উদ্দেশে পশু বা বিভিন্ন বস্তু বলি দেওয়ার প্রচলন ছিল। উল্লেখ্য, এ নমরুদের অত্যন্ত কাছের ছিলেন আযর। আযরের ঐরসজাত সন্তান ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হজরত ইব্রাহিম (আ.)। নমরুদ নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করত। নমরুদের নিকট আযরের পুত্র ইব্রাহিমের (আ.) কথা পৌঁছলে ইব্রাহিমকে দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে।

ইব্রাহিম (আ.)-কে আগুনে পুড়ে মারার নির্দেশ দেয়। অনেক আনন্দ করে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে আল্লাহর নবীকে আগুনে নিক্ষেপ করে। কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে ইব্রাহিমের কিছুই হয়নি। তবে অনেক সময় ধরে তাকে আগুনে থাকতে হয়েছিল। ওই সময়টাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ওই অলৌকিক ঘটনা দেখে ইব্রাহিমের (আ.) প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা। তার প্রেক্ষিতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে উসিলা করে পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে। নাজিল হয়েছে তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাব। তাকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে অনেক কাহিনী ও ঘটনা। ইব্রাহিম (আ.) আদিষ্ট হয়েছিলেন প্রিয় পাত্র অর্থাৎ একমাত্র ছেলেকে কোরবানি করতে। যদিও অন্য সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সাথে মুসলমানদের কোরবানির ব্যাপক তফাত আছে। মুসলিম মতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, যার যত প্রিয় বস্তু আছে তাকে তত বেশি ত্যাগ করতে হয়। প্রিয় বস্তুকে অন্যের মঙ্গলের জন্য নিবেদন বা ব্যবহার করতে হয়। 

মুসলমানরা কোরবানির দিন ঈদুল আজহা পালন করেন। বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, কোরবানির প্রায় ৩৬০০ বছর পর ঈদুল আজহা শুরু হয়েছে। হজরত মোহাম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরত করার পরবর্তী বছর বছর অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় হিজরিতে মুসলমানদের জন্য দুটি ঈদ যথাক্রমে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালনের বিধান দেওয়া হয়েছে। মোট তিন দিন কোরবানি করা যায়, জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২ তারিখ। অবশ্য প্রতি বছর আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আজহা পালিত হয়ে আসছে। হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর সময়ে ঈদুল ফিতরের ন্যায় ঈদুল আজহাকেও একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য, আরব দেশে ইসলাম প্রচারের পূর্বে দুটি উৎসব প্রচলিত ছিলÑ যার একটি নওরোজ এবং অপরটি মেহেরজান। 

মুসলমানদের কোরবানি অত্যন্ত মহামান্বিত। কোরবানির সময় মুসলমানরা নামাজ, যাবতীয় এবাদত, জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর নামে ঘোষণা করেন। মুসলমানদের জন্য এটি একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ঈদের দিনে কোরবানিতে অনেক রক্ত উৎসর্গ হয়। হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘ঈদের দিনে রক্ত প্রবাহিত করা উত্তম কাজ। সমগ্ৰ মুসলিম জাহান সেই দিন কোরবানির রক্তে লালে লাল হয়ে আল্লাহর মহিমা প্রচার করে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই মহান আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য সামর্থ্যবান মুসলমানদের কোরবানি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’

কোরবানি ত্যাগের মহিমা প্রচার করে এবং আদর্শের নির্দেশনা দেয়। এ ত্যাগ শুধু পশু জবাইতেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন আবশ্যক। কোরবানির জন্য যেভাবে সকল কিছুতে উৎসর্গ করার বিধান রয়েছে বর্তমান সময় তা অনেকটাই দেখা যায় না। মানুষ অনেকেই বড় বড় ও নামি-দামি পশু জবাই করে বটে। কিন্তু তাদের অনেকের অর্থোপার্জনের পথ অস্বচ্ছ। তাদের মধ্যে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার অভাব রয়েছে। মানুষের কল্যাণেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মনিবেদিত হওয়া, মানুষের মঙ্গল করাতেই মানবতার প্রতিফলন ঘটে।

কোরবানি আল্লাহর প্রেমে তাকওয়া শেখায়। এর বড় তাকওয়ার প্রধান ও শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মধ্যে দেখা গিয়েছিল। তার নিকট প্রিয় পুত্রের চেয়ে বিশাল ও বড় হয়ে উঠেছিল আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবচেয়ে প্রিয় একমাত্র পুত্র ইসমাইলকে সোপর্দ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তার ওই মহান ত্যাগ পৃথিবীর মানুষকে আত্মবিসর্জনের শিক্ষা দেয়। এ ছাড়া গুনাহ, হিংসা, লোভ, অহংকার ইত্যাদির বদলে অন্তরে ভালোবাসা জন্ম দিয়ে মানুষে মানুষে একাত্মতা সৃষ্টির অনুপ্রেরণাও রয়েছে কোরবানিতে। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। বিবেককে নির্মল করে। বস্তুত কোরবানি শব্দটিই জীবনের ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে কাজ করে। ভালোবাসা, ত্যাগ ও আত্ম নিবেদনের জন্য উজাড় করে দেয়। প্রভুর জন্য, তাঁর ভালোবাসার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস সৃষ্টি করে।

লেখাটির শেষ অংশে এসে কোরবানি সম্পর্কে আমাদের একটি জাতীয় ও মুসলিম গৌরবের কথা শোনাচ্ছি। আর তা হচ্ছে সমগ্ৰ বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি কোরবানি করে আসছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর কোরবানি করা হয় প্রায় এক কোটি পশু। গরুই সবচেয়ে বেশি কোরবানি হয়। তারপর করা হয় ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। যেখানে ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসহ কমবেশি প্রায় দুশ দেশের মুসলমান ছয় কোটি কোরবানি করে, সেখানে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে এক কোটি কোরবানি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বিশ্বে কোরবানিতে বাংলাদেশই প্রথম। দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান। পাকিস্তানিরা কোরবানি করে প্রায় আশি লাখ পশু। তৃতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব। অবশ্য সৌদিতে হজব্রত পালনকারীরা কয়েক লাখ পশু কোরবানি করে থাকেন। অন্যদিকে তুরস্কে গরু, মহিষ, ভেড়া মিলে প্রায় বিশ লাখ এবং ইন্দোনেশিয়ায় আঠারো-উনিশ লাখ পশু কোরবানির আওতায় আসে। আমরা বেশি পশু জবাই করি, কোরবানি দিই। কিন্তু অনেকেই আমাদের তাকওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ প্রশ্ন ওঠে সংগত কারণেই। দেখা যায়, একজন বিত্তবান লাখ বা তারও বেশি দামে পশু কোরবানি দিচ্ছে। কিন্তু তার পাশের বাড়ির দরিদ্র মানুষটি না খেয়ে থাকছে। এটা ইসলামের শিক্ষা ও কোরবানির আদর্শের বিপরীত। তাই এটা বলা অসঙ্গত নয় যে, কোরবানির সংখ্যা বেশি হওয়া মানেই ইসলামের আদর্শের নিশানবরদার হওয়া বোঝায় না।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কোরবানী’, কবিতায় বলেছেনÑ “ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন/ জোর চাই, আর যাচনা নয়,/ কোরবানী-দিন আজ না ওই?/ বাজনা কই? সাজনা কই?/ কাজ না আজিকে জান-মাল দিয়ে মুক্তির উদ্রধরণ?/ বল- ‘যুঝবো জান-ভি পণ!’/ ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,/ আজ আল্লার নামে জান কোরবান ঈদের পূত-বোধন।” শুধু পশু বধ নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানসিক পশুত্বকে বিসর্জনের প্রতীক হিসেবে কোরবানিকে কার্যকর করার কথা বলেছেন জাতীয় কবি। বলেছেন, ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের আদর্শ ধারণ করে সত্যের লড়াইয়ে বীরের মতো আত্মত্যাগে বলীয়ান হতে। আর সেটিই হোক আমাদের ব্রত। 


নূরুদ্দীন দরজী 

কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষা অফিসার

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা