× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কোরবানির শিক্ষা

ড. দেওয়ান আযাদ রহমান

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম

কোরবানির শিক্ষা মানুষকে ত্যাগ সহমর্মিতা ন্যায়বোধ ও মানবতার পথে পরিচালিত করার অনন্য বার্তা দেয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কোরবানির শিক্ষা মানুষকে ত্যাগ সহমর্মিতা ন্যায়বোধ ও মানবতার পথে পরিচালিত করার অনন্য বার্তা দেয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কোরবানি ইসলামের একটি মহান ইবাদত এবং মানবজীবনের জন্য গভীর নৈতিক শিক্ষা। এটি শুধু পশু জবাই করার অনুষ্ঠান নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু, অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতা ত্যাগ করার বাস্তব অনুশীলন। ঈদুল আজহার সময় মুসলিম সমাজ আনন্দ করে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে, খাবার ভাগ করে  খায় এবং দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু এই উৎসবের আসল সৌন্দর্য থাকে অন্তরের তাকওয়া, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধে। কোরবানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ সম্পদ আল্লাহর দান, জীবন আল্লাহর আমানত এবং সব কাজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

কোরবানির ইতিহাসের সঙ্গে নবী হযরত ইবরাহীম (আ.) ও নবী ইসমাঈল (আ.)-এর আনুগত্য ও ত্যাগের স্মৃতি জড়িত। ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের আবেগ, যুক্তি ও পারিবারিক ভালোবাসাকে নত করেছিলেন। ইসমাঈল (আ.) ধৈর্য, আনুগত্য ও ঈমানের পরিচয় দিয়েছিলেন। এই ঘটনা মানুষকে শেখায় যে সত্যিকারের ঈমান কেবল মুখের দাবি নয়; কঠিন অবস্থায় আল্লাহর আদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামই প্রকৃত ঈমান। তাই কোরবানি শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বর্তমান জীবনের জন্যও একটি জীবন্ত শিক্ষা।

আল্লাহর কাছে বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, অন্তরের পবিত্রতা মূল্যবান। কোরবানির পশু বড় বা দামি হলেই ইবাদত বড় হয় না; বরং নিয়ত, সততা ও আল্লাহভীতি ইবাদতের মান নির্ধারণ করে। কোরবানি যদি লোকদেখানো, নামপ্রকাশ বা সামাজিক প্রতিযোগিতার জন্য হয়, তবে তার মূল শিক্ষা হারিয়ে যায়। প্রত্যেক কাজের মতো কোরবানিতেও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। এই শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে সুন্দর করে এবং সমাজকে শান্তিপূর্ণ করে তোলে।

কোরবানি মানুষকে ত্যাগের আনন্দ শেখায়। নিজের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রের জন্য ব্যয় করলে মানুষ বুঝতে পারে, সুখ কেবল নিজের ভোগে নয়; অন্যকে সুখী করাতেও আছে। কোরবানির মাংস বিতরণ শুধু দয়া নয়, এটি সামাজিক ন্যায়ের অনুশীলন। দরিদ্র মানুষ যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই দায়িত্ব কোরবানি আমাদের সামনে তুলে ধরে। ধনী-গরিব, আত্মীয়-প্রতিবেশী ও পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মধ্যে খাবার ও ভালোবাসা ভাগ হলে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক শক্ত হয়।

আধুনিক সমাজে মানুষ বেশি পাওয়া, বেশি দেখানো এবং বেশি জমা করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কোরবানি শেখায়, প্রকৃত সম্মান সম্পদ প্রদর্শনে নয়; চরিত্র, দানশীলতা ও তাকওয়ায়। সম্পদ আল্লাহর আমানতÑ এই বিশ্বাস মানুষকে হালাল উপার্জন, সৎ ব্যয়, অপচয় থেকে বিরত থাকা এবং দরিদ্রের অধিকার আদায় করতে শেখায়। পশু জবাইয়ের পাশাপাশি নিজের ভেতরের অহংকার, ঈর্ষা, কৃপণতা ও স্বার্থপরতাকেও বর্জন কোরবানির অন্যতম শিক্ষা। মানুষ যখন নিজের খারাপ প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, তখন তার ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে কোরবানির তাৎপর্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অনেক মানুষ আর্থিক কষ্টে জীবন যাপন করে। তাই কোরবানি হতে পারে সামাজিক সহায়তার বড় সুযোগ। যদি প্রত্যেক কোরবানিদাতা শরিয়তের বিধিবদ্ধ নিয়ম আনুযায়ী মাংস বিতরণ করে, তাহলে কোরবানি সমাজে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করবে। কোরবানির পর রক্ত, বর্জ্য ও ময়লা সঠিকভাবে পরিষ্কার করা সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। ইবাদতের নামে অন্যের কষ্ট বা পরিবেশদূষণ করা কোরবানির শিক্ষার বিরোধী।

কোরবানির সঙ্গে কৃষক, খামারি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও কসাইসহ বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই এই সময় সততা, ন্যায্য দাম, শ্রমের সম্মান এবং প্রতারণা থেকে বিরত থাকা জরুরি। অসুস্থ পশু বিক্রি, অতিরিক্ত দাম নেওয়া, ওজনে কম দেওয়া বা শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা কোরবানির নৈতিকতার পরিপন্থি। কোরবানি আমাদের শেখায়, ইবাদত শুধু মসজিদ বা ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; বাজার, লেনদেন, শ্রম ও সামাজিক সম্পর্কেও বিদ্যমান। 

তরুণ প্রজন্মের জন্য মূল্যবোধের পাঠ হতে পারে কোরবানি। শিশু-কিশোররা ঈদুল আজহার সময় কোরবানির আয়োজন দেখে বড় হয়। তাদের বোঝানো দরকার যে কোরবানি শুধু আনন্দ বা খাবারের উৎসব নয়; এটি আনুগত্য, দয়া, সামাজিক দায়িত্বশীলতা,পরিচ্ছন্নতা, সততা ও মানবতার শিক্ষাও। পরিবার, মসজিদ, বিদ্যালয় ও সমাজ যদি তরুণদের এই শিক্ষা দেয়, তবে তারা ভবিষ্যতে বেশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু দক্ষ মানুষ নয়, নীতিবান মানুষও দরকার।

কোরবানি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও শিক্ষণীয়। এ উৎসব মুসলমানদের ইবাদত হলেও এর মানবিক দিক সবার জন্য উপলব্ধিযোগ্য। প্রতিবেশী অমুসলিম পরিবার, দরিদ্র শ্রমজীবী, পথশিশু বা অসহায় বৃদ্ধদের সম্মান দিয়ে সাহায্য করলে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ে। বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। তাই কোরবানির শিক্ষা কখনও বিভাজন সৃষ্টি করে না; বরং মানুষকে দয়া, সৌজন্য ও সহযোগিতার পথে ডাকে। উৎসবের আনন্দ যেন কারও ভয়, বিরক্তি বা অসুবিধার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকাও কোরবানির শিক্ষা।

মানবতার কল্যাণে কোরবানি একটি মহান আদর্শ। এটি আমাদের শেখায় আত্মত্যাগ, আল্লাহভীতি, সহমর্মিতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। কোরবানির দিনে পশু কোরবানি করা যেমন ইবাদত, তেমনি মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করাও বড় ইবাদত। যদি আমরা কোরবানির মর্ম বুঝে জীবনে প্রয়োগ করি, তাহলে সমাজে ভালোবাসা, ন্যায়, দয়া ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। কোরবানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পদে নয়, বরং ত্যাগে; ক্ষমতায় নয়, সেবায়, কথায় নয়, কাজে। তাই কোরবানির আসল শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের প্রত্যেকের উচিত মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।


ড. দেওয়ান আযাদ রহমান

কলাম লেখক ও গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা