বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা
কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
একসময় বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র ছিল আটলান্টিক উপকূল -ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস কিংবা মস্কো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন ভূরাজনীতি কেবল সামরিক জোটের খেলা নয়, এটি প্রযুক্তি, জ্বালানি, সাপ্লাই চেইন, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা এবং সমুদ্র বাণিজ্যকে ঘিরে এক বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা। মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন, “The new world order cannot happen without U.S. participation.” কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, বিশ্ব এখন আর একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই বরং এটি বহু মেরুর জটিল সমীকরণে প্রবেশ করেছে।
মধ্য এশিয়ার জ্বালানি করিডর থেকে এশিয়া-প্যাসিফিকের নৌ কৌশল, নর্ডিক রাষ্ট্রগুলোর কল্যাণমূলক অর্থনীতি থেকে পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা সংকট। সব মিলিয়ে পৃথিবী আজ এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা, যেখানে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির নতুন কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ায় সরে আসছে। বিশেষত চীন তার উৎপাদন, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয় এটি মূলত একটি ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। যার মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অপরদিকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জ্বালানি ও সামরিক কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে মধ্য এশিয়া, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে। রাশিয়ার গ্যাস ও তেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে ইউরোপ একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে। অন্যদিকে কাতার, সৌদি আরব ও মধ্য এশিয়ার দিকে তাকাতে বাধ্য হচ্ছে।
মধ্য এশিয়া বর্তমানে ‘নতুন গ্রেট গেম’এর কেন্দ্রবিন্দু। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের বিপুল গ্যাস ও খনিজ সম্পদকে ঘিরে চীন, রাশিয়া, ইউরোপ ও তুরস্কের কৌশলগত আগ্রহ বাড়ছে। কাস্পিয়ান করিডোর, ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রুট এবং রেল-সংযোগ প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা এ অঞ্চলের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত থিয়েটার। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি, কোরীয় উপদ্বীপ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রজোটকে শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে চীন সামুদ্রিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তারে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে। কোয়াড, অকাস কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ফলে বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ এখন কেবল অর্থনৈতিক করিডোর নয়; এটি পরিণত হয়েছে সামরিক ও কৌশলগত শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে।
জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক- “Power is not a means; it is an end.” বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অনেক বাস্তবতা যেন এই কথারই প্রতিফলন।
ইন্দোচীন অঞ্চলেও নতুন বাস্তবতা দৃশ্যমান। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাওসের মতো দেশগুলো একদিকে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণ করছে। অন্যদিকে মার্কিন ও জাপানি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বও বজায় রাখছে। এই ‘ব্যালান্সিং ডিপ্লোম্যাসি’ এখন ছোট ও মাঝারি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে নর্ডিক দেশগুলো সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে গণতন্ত্র, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও কল্যাণরাষ্ট্র একসাথে এগোতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোমুখিতা প্রমাণ করে নিরাপত্তা বাস্তবতা আদর্শিক নিরপেক্ষতাকেও বদলে দিতে পারে। জলবায়ু অভিযোজন, সবুজ জ্বালানি ও মানবিক উন্নয়নে নর্ডিক মডেল আজও বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর উদাহরণ।
পূর্ব ইউরোপ বর্তমানে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের কেন্দ্র। ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় এটি বৈশ্বিক খাদ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গম, সার ও জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ব্যাপক চাপে ফেলেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, বিশেষত প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে।
মধ্যপ্রাচ্যেও নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার কিংবা ইরান। সবাই এখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, পর্যটন ও বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে ইরান-ইসরাইল বৈরিতা, গাজা সংকট, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও জ্বালানি রুটের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
বিশেষত ইরান–ইসরাইল–আমেরিকা ত্রিমুখী উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত অগ্নিবলয়ে পরিণত করেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরাইলের নিরাপত্তা-আশঙ্কা এবং মার্কিন ভূকৌশলগত উপস্থিতি এমন এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও প্রক্সি কনফ্লিক্ট, সাইবার হামলা, গোয়েন্দা অভিযান ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা গাজা-সবখানেই এই বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়া দৃশ্যমান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি উত্তেজনা এখন বৈশ্বিক তেলের বাজার, ডলার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে প্রভাবিত করে।
আলবার্ট আইনস্টাইন সতর্ক করে বলেছিলেন, “Peace cannot be kept by force; it can only be achieved by understanding.” অথচ বাস্তব বিশ্বে শক্তির রাজনীতি প্রায়ই সেই উপলব্ধিকে অতিক্রম করে যায়।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের পুরোনো ধারণাও নতুনভাবে ফিরে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন আর একক শক্তির ছত্রছায়ায় থাকতে চায় না। তারা চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া সব পক্ষের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। “স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি” এখন অনেক দেশের কূটনৈতিক দর্শন। একইভাবে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি।
বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ আজ নানা প্রশ্নের মুখে। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো কাঠামো, যুদ্ধ প্রতিরোধে সীমিত সক্ষমতা এবং জলবায়ু ও মানবিক সংকটে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। তবু বহুপাক্ষিক সংলাপের জন্য জাতিসংঘের বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
কফি আনান যথার্থই বলেছিলেন, “Arguing against globalization is like arguing against the laws of gravity.” কিন্তু এই বিশ্বায়ন যদি বৈষম্য, যুদ্ধ ও আধিপত্যের বাহন হয়ে ওঠে, তবে তা মানবতার জন্য নতুন সংকটও সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিশ্বে অর্থনৈতিক ভূরাজনীতি এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা নিয়ন্ত্রণ আগামী দিনের শক্তির উৎস হয়ে উঠছে। যে রাষ্ট্র প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়াবে, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তার হাতেই থাকবে। ফলে উন্নয়ন এখন আর কেবল জিডিপির অঙ্ক নয়; এটি জ্ঞান, উদ্ভাবন ও কৌশলগত সক্ষমতার সমন্বিত রূপ।
উত্তরণের দিকনির্দেশনা
১. উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একমুখী নির্ভরতা পরিহার করে বহুমাত্রিক কূটনীতি গড়ে তুলতে হবে।
২. খাদ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
৩. আঞ্চলিক সহযোগিতা-বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও এশিয়া-প্যাসিফিকে-বাণিজ্য ও সংযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহারে আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি।
৫. ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং জাতিসংঘভিত্তিক মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে।
৬. জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।
৭. মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
বর্তমান বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও অর্থনৈতিক মন্দা, কোথাও প্রযুক্তিগত বিপ্লব-সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা নতুন এক যুগে প্রবেশ করছে। আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায়, “The old world is dying, and the new world struggles to be born.” সত্যিই, পুরোনো শক্তিসাম্য ভেঙে নতুন বিশ্বব্যবস্থা জন্ম নিচ্ছে। এই যুগে টিকে থাকবে তারাই, যারা কৌশলগত দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতা এবং মানবিক ভারসাম্যের সমন্বয় ঘটাতে পারবে। বহুমেরুর এই বিশ্বে শক্তির ভাষা বদলাচ্ছে, এখন প্রয়োজন সংঘাত নয়, সহাবস্থান ও প্রজ্ঞাভিত্তিক নেতৃত্ব।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি