নিষ্পাপ কন্যাশিশু রামিসা হত্যার প্রতিবাদে জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশ। হত্যাকারী পিশাচ সোহেলের দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবিতে দেশজুড়ে উত্তাল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নিষ্পাপ কন্যাশিশু রামিসা হত্যার প্রতিবাদে জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশ। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া প্রতিটি শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, নগর-জনপদ আজ রামিসা হত্যাকারী পিশাচ সোহেলের দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবিতে উত্তাল। পথে নেমে এসেছে দলমত-নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবনিতা। তাদের দাবি একটাইÑ শুধু রামিসা হত্যা নয়, বন্ধ করতে হবে সব নারী ও শিশু নির্যাতন। এজন্য প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী |
গতকালের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলÑ ‘রাগে কাঁপছে দেশ’। প্রতিবেদনে শিশু রামিসার ওপর বর্বর নির্যাতন ও তাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গোটা বাংলাদেশের আপামর মানুষের ক্ষোভের চিত্র যথার্থভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন করছে বিক্ষুব্ধ ও নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষ। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তরুণ সমাজ, যারা একটি শান্তিময় বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিহত নারী ও শিশু নির্যাতনবাবার একটি খেদোক্তি বিবেকবান মানুষের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। সন্তানহারা পিতা আবদুল হান্নান বলেছেন, ‘আমি আর বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ তার এ ক্ষোভমিশ্রিত উক্তি আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি এক চপেটাঘাত। রামিসার পিতা শোকে বিহ্বল হয়ে যে উক্তি করেছেন, তা এদেশের মানুষের প্রাণেরই উক্তি। কেননা, বিচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের রেহাই পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয় সব সময়। মামলা, তদন্ত, আদালতে চার্জশিট দাখিল ইত্যাদি প্রক্রিয়া শেষে যখন একটি খুন বা ধর্ষণ মামলার বিচারকার্য শুরু হয়, তখন বেলা অনেক গড়িয়ে যায়। বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হতে হতে একসময় বিচারের আশা পরিত্যাগ করে হারানো সন্তান বা স্বজনের জন্য দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাগ্যের দোষ দিয়ে মনকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনও দেখা গেছে, বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে বিচারপ্রার্থী ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছেন। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণেই ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ প্রবচনটির উদ্ভব। যার অর্থÑ ‘বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই ন্যায়বিচার অস্বীকার করা।’ এই আপ্তবাক্য সব সময় আওড়ানো হলেও অব্স্থার কোনো পরিবর্তন এখন অবধি হয়নি। অত্যাচারিত, নির্যাতিত কিংবা স্বজনহারা একজন মানুষকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় অসহায়ের মতো ঘুরতে হয় দ্বারে দ্বারে।
আজ রামিসাকে নির্যাতন ও হত্যা নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। সমাজের বিশিষ্টজনরা নানা অভিমত ব্যক্ত করছেন। কেউ বলছেন সমাজে পচন ধরেছে, কেউ বলছেন মূল্যবোধে ধরেছে ক্ষয়রোগ। কেউবা দায়ী করছেন অধঃপতিত সমাজব্যবস্থাকে। অনেকে দায়ী করছেন মাদক ও পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তারকে। এর কোনোটাই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সবগুলো মিলে আমাদের সমাজকে আজ অক্টোপাসের ন্যায় গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। কারও কারও মতে এ সমাজ আর মানুষের বসবাসের যোগ্য নেই। এ যেন হয়ে উঠেছে শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্য; যেখানে হিংস্র বাঘ-চিতাবাঘ, হায়েনা-সিংহ খাবলে খায় হরিণ কিংবা হরিণ-শাবকের দেহ। নিহত রামিসা আর ধর্ষক-খুনি সোহেল যেন হরিণ শিশু ও হিংস্র হায়েনার প্রতীক।
মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, সমাজে একশ্রেণির মানুষের মানসিকতায় ধস নেমেছে। নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য এরা কন্যাসম শিশুর ওপর হামলে পড়তেও দ্বিধা করছে না। সচেতন ব্যক্তিদের অভিমত, বিচারহীনতাই এর প্রধান কারণ। কেননা, একটি অপরাধের বিচার না হলে আরেকটি অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্র তৈরি হয়। একজন খুনি বা ধর্ষক অপরাধ করেও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। এক পর্যায়ে স্বল্প মেয়াদি সাজা ভোগ করে, আবার কখনও ‘বেকসুর’ খালাস পেয়ে যায়। ফলে অপরাধ সংঘটনে ভীতি কমে যাচ্ছে। এভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার গিয়েছিলেন নিহত রামিসার বাসায়। তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন রামিসার পিতা-মাতা ও স্বজনদের। বলেছেন, অতি দ্রুত এই নির্মম পাশবিক হত্যার বিচার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন কন্যা সন্তানের পিতা। তিনি নিশ্চয়ই তার হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন রামিসার পিতা-মাতার বুকে সৃষ্টি হওয়া শূন্যতাকে, হাহাকারকে। তাদের মর্ম যাতনার কথা ভেবেই তিনি সেখানে ছুটে গিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ দায়িত্বশীলতাকে অভিনন্দিত করেছে দেশবাসী। কিন্তু ক’জনের বাসায় যাবেন তিনি? কয়জন রামিসার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেবেন? আমরা বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রীকে যেন আর কোনো রামিসার বাসায় ছুটে যেতে না হয়, সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর সেটা তিনি পারবেন, এ ভরসা দেশবাসীর রয়েছে। সবারই স্মরণে থাকার কথা, একসময় আমাদের দেশে অ্যাসিড-সন্ত্রাস মহামারির আকার ধারণ করেছিল। সে সময় দেশবাসীর দাবি অনুযায়ী অ্যাসিড নিক্ষেপের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পর সে প্রকোপ কমে গেছে। শিশু নির্যাতন-বিরোধী আইন রয়েছে দেশে। তবে তা বোধ করি পর্যাপ্ত নয়। এখন সময় এসেছে সে আইন পরিবর্তন করে বিশেষ আইন করার। ঘটনার এক মাসের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিভীষিকা থেকে জাতি রক্ষা পেতে পারে।
অকাল প্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেনÑ ‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ কবির সে অঙ্গীকার আমরা রক্ষা করতে পারিনি। রামিসার করুণ মৃত্যুই তার সর্বশেষ উদাহরণ। আমাদের এ ব্যর্থতা ক্ষমার অযোগ্য।