আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১৩:৪৩ পিএম
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেওয়ার চেয়ে নিজেদের ব্যালেন্স শিট বা আর্থিক হিসাবের ভারসাম্য সুরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
নির্বাচনের ঠিক পর পর ঢাকার একটি মাঝারি গোছের পোশাক কারখানার মালিক ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম) আশা করেছিলেন, এবার হয়তো সুদিন ফিরবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে ব্যাংকের দরজা খুলবে, নতুন মেশিনারি আমদানি করে ব্যবসাটা বড় করবেন। কিন্তু ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের টেবিলে বসতেই তার সেই আশায় ঠান্ডা জল ঢেলে দেওয়া হলো। ব্যাংক থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো, ‘আপাতত নতুন বড় ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়।’
ফয়সাল আহমেদের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই আজ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন। নতুন সরকার গঠনের পর যেখানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জোয়ার আসার কথা ছিল, সেখানে চলতি বছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে। এটি আমাদের অর্থনীতির ভেতরের গভীর ক্ষত ও উদ্যোক্তাদের চরম আস্থার সংকটের এক জীবন্ত উদাহরণ।
প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, সমস্যাটা আসলে কোথায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির টানাপড়েনÑ উভয় দিকই খতিয়ে দেখতে হবে। প্রথমত, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আমাদের আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিকে আঘাত করেছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং এর জের ধরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। এর ওপর রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং স্থানীয় বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি দেশীয় আমদানিকারক ও নতুন উদ্যোক্তাদের হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এমন তীব্র অস্থিতিশীল পরিবেশে নতুন করে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না কোনো বিনিয়োগকারী।
তবে সংকটের দায় পুরোপুরি বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের ব্যাংকিং খাতের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বড় ধরনের কাঠামোগত সংকট। বিগত বছরগুলোতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নির্দিষ্ট কিছু বড় ঋণগ্রহীতাকে ঢালাওভাবে ঋণ দিয়েছে। সেই ঋণের একটি বড় অংশ আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি, যা খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি করেছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি এবং প্রভিশন রাখার তীব্র চাপে জর্জরিত।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দেওয়ার চেয়ে নিজেদের ব্যালেন্স শিট বা আর্থিক হিসাবের ভারসাম্য সুরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যাংকগুলো কিন্তু মুনাফা করা বন্ধ করেনি। তারা বেসরকারি খাতে ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ ও সহজ আয়ের পথ বেছে নিয়েছে তা হলো সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ। সরকার যখন নিজের ঘাটতি বাজেট মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দেদারসে ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলো সানন্দে সেই টাকা সরকারের হাতে তুলে দেয়। কারণ এখানে খেলাপি হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই, আবার মুনাফাও নিশ্চিত। ফলশ্রুতিতে, সরকারি ঋণ দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতকে সংকুচিত করে তুলছে এবং বেসরকারি খাতকে চরমভাবে কোণঠাসা করে ফেলছে।
অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে একটি ‘নিম্ন-ভারসাম্যের ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র: বাজারে আস্থা কম থাকায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন না; অন্যদিকে ঝুঁকি বেশি থাকায় এবং সরকারি বন্ডের মতো নিরাপদ বিকল্প থাকায় ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে না। বিনিয়োগ ও আমদানি সংকুচিত হওয়ার কারণে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করছে। আর এই ধীরগতির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন ঋণের চাহিদাকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
যদিও কোনো কোনো নীতিনির্ধারক আশা করছেন, শিগগির এই মন্দা কেটে যাবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু শুধু কম মূল্যস্ফীতি বা স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর ভরসা করে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। যতক্ষণ না ব্যাংকিং খাতের ভেতরের সুশাসন নিশ্চিত হচ্ছে এবং সরকারের ঢালাও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমছে, ততক্ষণ বেসরকারি খাতের এই খরা কাটবে না। এই অন্ধকারের বৃত্ত থেকে বের হতে হলে আমাদের নীতিনির্ধারকদের অতি দ্রুত এবং দৃশ্যমান কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।
১. সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর আহরণ বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধে কঠোর হতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ডে টাকা অলস বসিয়ে না রেখে বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে উৎসাহিত হয়।
২. ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও স্বাধীন ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে খেলাপি ঋণ আদায়, বড় ঋণগ্রহীতাদের কঠোর নজরদারি এবং ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।
৩. উৎপাদনশীল খাত, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় কম সুদে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহজ করে উদ্যোক্তাদের মাঝে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
আহমেদ তোফায়েল
সিনিয়র সাংবাদিক