মো. মামুন হাসান
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১৩:০০ পিএম
মো. মামুন হাসান। ফাইল ছবি
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ, আনুগত্য এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শিক্ষা বহনকারী এ উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পশু কোরবানি। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি কোরবানি ঘিরে গড়ে ওঠে একটি বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে লাখো খামারি, পশু ব্যবসায়ী, পশুহাট, পরিবহন খাত, চামড়া শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতি। আসন্ন ঈদুল আজহা-২০২৬ সামনে রেখে সরকার বহুমাত্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, যাতে উৎসবটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতের জিডিপিতে অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশে। প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে বছরে যেখানে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। একইভাবে মাংস উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৮৯ লাখ মেট্রিক টনে এবং ডিম উৎপাদন ১৫০ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর খামার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহায়তার ফলে প্রাণিসম্পদ খাত জাতীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় শক্তিশালী খাতে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রেস কনফারেন্সে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সম্ভাব্য প্রাপ্যতা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং উট, দুম্বাসহ অন্যান্য প্রজাতির ৫ হাজার ৬৫৫টি পশু। অন্যদিকে, বিভাগীয় পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই তথ্য কোরবানির পশু উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ইতিবাচক প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোরবানির পশুর জোগানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৩ জন খামারির প্রচেষ্টায় সেখানে ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬২৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯টি। ফলে প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। রংপুর বিভাগে প্রায় ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি পশুর প্রাপ্যতার বিপরীতে চাহিদা ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। খুলনা বিভাগেও প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৬০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগেও চাহিদার তুলনায় পশুর প্রাপ্যতা বেশি থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সম্ভাব্য প্রাপ্যতা ধরা হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। প্রাথমিকভাবে উদ্বৃত্তের সম্ভাবনা থাকলেও ঈদের পর দেখা যায়, প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু জবাই হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থেকে যায়। এ বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, দেশীয় খামারিরা এখন জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং কোরবানির সময় বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমেছে।
কোরবানির পশু দ্রুত মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, ক্ষতিকর হরমোন ও অননুমোদিত ওষুধ ব্যবহারের অভিযোগ রোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ বিষয়ে ৭৩ হাজার ৪৬৫ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৬ হাজার ৭৮১টি উঠান বৈঠক, ২ লাখ ৯১ হাজার ২৫৮টি লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ এবং ৫৭ হাজার ৫১৬টি খামার পরিদর্শনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
সরকার অবৈজ্ঞানিকভাবে মোটাতাজাকরণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন পশুহাটে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৬টি পশুহাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম, বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম, কন্ট্রোল রুম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করবে।
পশুবাহী যানবাহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা হবে এবং পথে হয়রানি বা চাঁদাবাজি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবে। প্রাণিকল্যাণ আইন-২০১৯ অনুযায়ী পশুর প্রতি মানবিক আচরণ ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে সীমান্তপথে অবৈধ গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চালানো হবে।
ডিজিটাল সেবার বিস্তারের ফলে অনলাইনে পশু বিক্রিও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ঈদে ৪০৯টি অনলাইন প্লাটফর্ম ও ৬১৪টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-ভিত্তিক পেজের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ হাজার ৬২৬টি পশু বিক্রি হয়, যার লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৮৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ বছরও অনলাইন বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে। সহযোগিতা ও তথ্যসেবার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হটলাইন নম্বর ১৬৩৫৮ চালু থাকবে।
কোরবানির পর পশুবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়া সংরক্ষণ প্রতিবছরই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ বাস্তবতায় সরকার সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, ব্লিচিং পাউডার ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি চামড়ার অপচয় রোধ ও মান বজায় রাখতে ১৫ হাজার ৪৪৪ জন পেশাদার এবং ২২ হাজার ৯১৮ জন মৌসুমি কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রস্তুতি, প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বিত কার্যক্রম বলছেÑ এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই; বরং দেশীয় উৎপাদনের সক্ষমতা নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। একসময় কোরবানির সময় বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরতা থাকলেও বর্তমানে দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত পশুই জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি শুধু প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নের প্রতিফলন নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থারও একটি ইতিবাচক অর্জন।
সরকারের পাশাপাশি খামারি, ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই ঈদুল আজহা ২০২৬-কে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও সফল করে তুলতে পারে। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ একদিকে যেমন দেশীয় প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে কোরবানির ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্যকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।
মো. মামুন হাসান
সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়