ইমেইল থেকে
কানিজ সুবর্ণা বাবলি
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ১২:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
সাম্প্রতিক তীব্র দাবদাহ, পানির হাহাকার আর শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার বুকজুড়ে ধূধূ বালুচর আমাদের প্রতিনিয়ত ফারাক্কা বাঁধের নির্মম বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার গেট একতরফাভাবে বন্ধ করে আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সেচের অভাবে মাঠের ফসল পুড়ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গিয়ে মানুষের খাওয়ার পানির উৎসগুলো অচল হয়ে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধটি ১৯৭৫ সালে চালুর পর থেকেই বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ুর ওপর এক স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যা বিগত পাঁচ দশক ধরে এদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলেছে।
ঐতিহাসিক হেলসিঙ্কি
নীতি ১৯৬৬ এবং জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী অববাহিকাভিত্তিক
অভিন্ন নদীর পানিতে ভাটির দেশের ন্যায্য ও প্রাকৃতিক অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে
স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শীত ও
বসন্তের শুষ্ক মাসগুলোতে যখন পদ্মায় পানির প্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে, তখন
ফারাক্কার ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি ভাগীরথী-হুগলী নদীতে সরিয়ে
নেওয়া হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির প্রবাহ
আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। এই তীব্র পানি সংকটের ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প
‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কুষ্টিয়া, যশোর,
ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। মাটিতে
প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মরুকরণ প্রক্রিয়ার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা
দিচ্ছে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং
বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সাধারণ
নলকূপগুলো অকেজো হয়ে গ্রামীণ জনপদে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট তৈরি করছে।
পানিতে আর্সেনিকের
ঘনত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়ে জনস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকিতে পড়ছে এবং নদীর স্বাভাবিক
মিষ্টি পানির প্রবাহ না থাকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গড়াই, মধুমতী ও পশুর নদী দিয়ে
সমুদ্রের ক্ষতিকর লবণাক্ত পানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার
পর্যন্ত প্রবেশ করছে, যা সুন্দরবনের অনন্য ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করছে। বিশ্ব ঐতিহ্য
সুন্দরবনের সুন্দরী ও গোলপাতা গাছ লবণাক্ততার কারণে ‘টপ ডাইং’ বা আগামরা রোগে
আক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছে এবং সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্যপ্রাণীদের সুপেয়
পানির উৎসগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনভূমির অস্তিত্বকে
হুমকির মুখে ফেলেছে।
লবণাক্ততার এই
আগ্রাসন মোংলা সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা, শিল্পকারখানার উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের
সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকেও তীব্রভাবে ব্যাহত করছে। আবার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়
বর্ষাকালে, যখন ভারত নিজের ভেতরের বন্যা সামলাতে একযোগে ফারাক্কার সবকটি গেট খুলে
দেয় এবং আমাদের ঘরবাড়ি ও ফসলের জমি মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত করে। এই শুষ্ক মৌসুমে
কৃত্রিম খরা আর বর্ষায় বন্যার মরণকামড় মূলত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি একটি
সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। নদী কোনো রাজনৈতিক
পণ্য নয়, কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি ভাটির দেশের কোটি কোটি মানুষের বেঁচে
থাকার মৌলিক অধিকার, সংস্কৃতি এবং জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত
৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে সুনির্দিষ্ট ‘গ্যারান্টি
ক্লজ’ না থাকার কারণে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য পানি পাচ্ছে না এবং চুক্তিটির মেয়াদ
শেষ হওয়ার মুখে এসেও এর স্থায়ী সমাধান আলোর মুখ দেখেনি। নদীর নাব্যতা হ্রাসের ফলে
নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ পলি জমে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার করে নদীর
গভীরতা কমছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীগুলো দুকূল ছাপিয়ে বিধ্বংসী বন্যার রূপ
নেয় এবং নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রতিবছর লাখো মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে
পরিণত হচ্ছে। পদ্মার বিলুপ্তি মানে শুধু পানির অভাব নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে থাকা শত
শত প্রজাতির দেশীয় সুস্বাদু মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়া। আমাদের জাতীয় মাছ
ইলিশসহ বিভিন্ন পরিযায়ী মাছের চলাচল এবং জীবনচক্র ফারাক্কা বাঁধের কারণে
স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার বড় প্রভাব পড়ছে দেশের লাখ লাখ মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের
ওপর। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে
দিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক নদী আইন মেনে পদ্মার পানির ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি হিস্যা
নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো কণ্ঠস্বর তোলা এবং কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ
গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশকে অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে অভিন্ন ৫৪টি নদীর অববাহিকাভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনার জোরালো দাবি তুলতে হবে। চীন, ভারত, নেপাল, ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নদী অববাহিকা কর্তৃপক্ষ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে পানির প্রবাহ কৃত্রিমভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়। নদী ও মানুষের এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের অভিন্ন নদীগুলোর ওপর অববাহিকাভিত্তিক অধিকার ফিরিয়ে আনতেই হবে, কারণ নদী না বাঁচলে সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং আমাদের অর্থনীতি সংস্কৃতি ও মানচিত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে ফারাক্কার এই একতরফা পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখনই টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
কানিজ সুবর্ণা বাবলি
শিক্ষার্থী ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা