× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

ট্রান্সজেন্ডারের প্রতি মানবিক হোন

মতি লাল দেব রায়

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ১২:২৯ পিএম

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম

ট্রান্সজেন্ডারের প্রতি মানবিক হোন

আমাদের সমাজে ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বৈষম্য ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার। জন্মের পর পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া, কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়া এবং প্রতিনিয়ত অপমানের মুখোমুখি হওয়াÑ এসবই তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা। অথচ তারাও এদেশের নাগরিক, তাদেরও সম্মান ও স্বাভাবিক জীবনের অধিকার রয়েছে। তাই হিজড়াদের প্রতি সরকার ও সাধারণ নাগরিকদের আরও মানবিক হওয়া খুবই জরুরি।

ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যারা নিজেদেরকে কেবল পুরুষ বা নারী এই দুটি প্রচলিত লিঙ্গের একটি হিসেবেও পরিচয় দিতে চান না বরং এমন একটি পরিচয় বহন করেন, যা এই বাইনারি ধারণার বাইরে। তৃতীয় লিঙ্গের ধারণাটি আন্তঃলিঙ্গ ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যাদের ক্রোমোজোম, হরমোন বা যৌনাঙ্গে এমন পার্থক্য থাকে, যা প্রচলিত পুরুষ বা নারী সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মেলে না। অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সার্জারির মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন।

ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি সমাজের এক বিচ্ছিন্ন অংশ তারা তাদের পেশা ও নিজেদের পরিচয় আড়াল করার জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সহজেই এই সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে মিশে যায়। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে হিজড়াদের নিয়ে যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এমনটি আর কোথায়ও দেখা যায় না। শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে হিজড়াদের (তৃতীয় লিঙ্গ) প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় :

১. সিউডো-হারমাফ্রোডাইট : এই শ্রেণিরা ২ ধরনের :

ক. ধরন ১ : বাইরে থেকে পুরুষ মনে হলেও ভেতরে এরা নারীদের মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ থাকে এবং তাদের আচরণ ও আকর্ষণ নারীদের মতো হয়।

খ. ধরন ২ : বাইরে থেকে নারী মনে হলেও ভেতরে পুরুষদের মতো অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ বা বৈশিষ্ট্য থাকে এবং আচরণ পুরুষদের মতো হয়।

২. আদর্শ বা জন্মগত ট্রান্সজেন্ডার : এরা মূলত প্রকৃত উভলিঙ্গ। জন্মের সময় এদের শারীরিক গঠন এমন থাকে যে, ছেলে বা মেয়ে কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করা যায় না।

৩. ট্রান্সজেন্ডার : এরা জন্মগতভাবে শারীরিক বা জৈবিকভাবে পুরুষ বা নারী হলেও, মানসিকভাবে নিজেদের বিপরীত লিঙ্গের মনে করেন। চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এরা নিজেদের শারীরিক পরিবর্তন ঘটান।

উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে ট্রান্সজেন্ডারদের শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয়ভাবে আকুয়া (মানসিকভাবে নারী) এবং জেনানা (অন্যান্য প্রকৃতি) ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়।

১. আকুয়া : যে সকল পুরুষ নারীর মতো সাজতে ভালোবাসে এবং নিজেকে নারী ভেবে মানসিক তৃপ্তি পায় তাদেরকে আকুয়া  ট্রান্সজেন্ডার বলে। তারা লিঙ্গ রূপান্তরকারী হিসেবে চিহ্নিত। ২. জেনানা : এরা হলো নারী সাজে সজ্জিত পুরুষ। এরা ট্রান্সজেন্ডার  সেজে কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। এরা স্বেচ্ছায় ট্রান্সজেন্ডারের দলে আসে। জেনানা ট্রান্সজেন্ডার আবার দুই ধরনের : ক) পৌরুষহীন জেনানা ও খ) যৌন ক্ষমতা সম্পন্ন জেনানা।

বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডার জনসংখ্য প্রায় ১২,৯২৬। যাদের বেশিরভাগ দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস। তারা চরম বৈষম্যের শিকার হন তার মধ্যে দরিদ্রতা, সামাজিক কুসংস্কার তাদেরকে ভিক্ষাসহ নানা পেশায় যেতে বাধ্য করে। ইদানীং তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নিজেদের সমাজে সম্পৃক্ত করতে চান। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় এই প্রথমবারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের নজরুল ইসলাম ঋতু। গত কয়েক বছর যাবৎ রাজনীতির প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়েছে। জামালপুর জেলা ১১-১৩ বছরের শিশুদের শিক্ষা টেক্সট বোর্ডের বইতে হিজড়া সম্পর্কে ইতিবাচক লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার নানা সময়ে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’ নামে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় ৫০-ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে মাসিক জনপ্রতি ৬০০/- টাকা করে বিশেষ ভাতা। ০৬-১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে স্তরভিত্তিক উপবৃত্তির ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্তরে ৭০০/-, মাধ্যমিক স্তরে ৮০০/-, উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে ১০০০/- এবং উচ্চ স্তরে ১২০০/- টাকা। বাংলাদেশের যেকোনো এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা তৃতীয় লিঙ্গের একজন ব্যক্তি ওই এলাকা হতে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।

তাদের সমাজের মানবিক আন্দোলন ও সংগ্রামে দেখা যায়। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে তারা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, অনেক আহত আন্দোলনকারীকে হাসপাতালে ভর্তি করতেও তাদের দেখা গেছে। তারা উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের সাহায্যে রক্ত দিয়েছেন। তাদের সার্বিক অবস্থার কথা চিন্তা করে সরকারের উচিত ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করা। শুধু পরিচয়পত্রে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ স্বীকৃতি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে কোটা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তারা ভিক্ষাবৃত্তি বা অনিরাপদ পেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের উচিত তাদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে নাগরিকদেরও মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে উপহাস করা মানবিকতার পরিচয় নয়। আমরা যদি তাদের মানুষ হিসেবে সম্মান দেই, কথা বলার সুযোগ দেই এবং সমাজের মূলধারায় গ্রহণ করি, তাহলে তারাও আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে।

আমি মনে করি, একটি সভ্য ও মানবিক সমাজ তখনই গড়ে ওঠে, যখন সেখানে দুর্বল ও অবহেলিত মানুষরাও সমান মর্যাদা পায়। তাই ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সমান অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করা। সরকার ও নাগরিক সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে এলে একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

 

মতি লাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা