শামসুল আলম
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ১৪:০৭ পিএম
ফাইল ছবি
চারটি ধারাবাহিক নির্বাচনে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে (যা বিরোধীদের কাছে প্রহসন এবং বিদেশির কাছে ‘ডিপলি ফ্লওড ইলেকশন’ (deeply flawed election)।
বিশাল উন্নয়ন শ্লোগান দিয়ে, সিস্টেমেটিক্যালি বিরোধী রাজনৈতিক ধারা নির্মুল করে শেখ হাসিনা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশে খুব নিরাপদে শাসন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মধ্য জুলাইতে তার সামান্য একটি উক্তি থেকে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে, প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
সরকারের বাহিনী কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। হত্যাকান্ড চালায়। ছাত্ররা ভয় না পেয়ে আত্মত্যাগ করে। প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়তে থাকে, পাশাপাশি জনগণও রাজপথে নামে।
রাজনৈতিক দলগুলো নেপথ্যে সক্রিয় ছিল। দেশীয় সংগঠকরা গ্রেপ্তার-হুমকির ভয় পাশ কাটিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করে। সরকার টিকাতে প্রথমে সেনাবাহিনী নামলেও শেষের দিকে জনগণের সাথে যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়নি। কিছু প্রবাসী সংগঠক চাপ দিতে থাকে হাসিনার শাসনের পতন ঘটানোর।
বিদেশীরা গোপনে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জোগায়। একজন নির্বাসিত আমলা রেজিম পরিবর্তন নিশ্চিত করতে জুলাই মাস বাড়িয়ে দেন পতন হওয়া অবধি। শেষ পর্যন্ত সকল চাপ, শত শত হত্যা, জনতার রাজপথ দখল, সেনাবাহিনীর মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার ফল স্বরূপ ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক হাসিনা প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। জনতা দখল করে নেয় গণভবন, পতন ঘটে ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের। জনতা এই তারিখটি পালন করে ‘৩৬ জুলাই’ হিসাবে।
গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কতৃত্ববাদী শাসন পতনের ঘটনাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিপ্লবতত্ত্ব, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক আন্দোলনের তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। ইতিহাসে বহু শক্তিশালী শাসক বা “স্থিতিশীল” মনে হওয়া শাসনব্যবস্থা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়েছে। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু প্রশাসন, নির্বাচন বা উন্নয়ন প্রকল্পে নয়, বরং শাসিত জনগণের সম্মতি, বৈধতা (legitimacy), এবং ভয়ভীতির কার্যকারিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
১. “ডেভেলপমেন্টাল অথরিটারিয়ানিজম” ও বৈধতার সংকট
শেখ হাসিনার শাসনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মেগা প্রকল্পের নামে অপরিণামদর্শী ভিশন ও মিশন সাজিয়ে লুটপাটের উন্নয়নভিত্তিক বৈধতা নির্মাণ। বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পদ্মা সেতু ইত্যাদির মাধ্যমে সরকার একটি ‘উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের’ বয়ান দাঁড় করায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এটিকে অনেক সময় ‘ডেভেলপমেন্টাল অথরিটারিয়ানিজম’ বলা হয়। যেখানে সরকার দাবি করে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রয়োজন।
এই মডেল কিছু সময় সফল হতে পারে। যেমন:
• সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান যুগ
• অথবা গণচীনে একদলীয় অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনীতির দমন, নির্বাচনি বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, গুম-গ্রেপ্তার, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং মতপ্রকাশের সংকোচন ধীরে ধীরে ‘পারফরম্যান্স লেজিটিমেসি’কে ক্ষয় করতে থাকে। উন্নয়ন তখন আর যথেষ্ট থাকে না, যদি মানুষ মনে করে রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায়, কোনো শাসনের স্থায়িত্ব কেবল বলপ্রয়োগে নয়, লেজিটিমেসি বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় নির্ভর করে। যখন জনগণের বড় অংশ মনে করে শাসন “ন্যায্য” নয়, তখন রাষ্ট্রের কঠোর শক্তিও অকার্যকর হতে শুরু করে।
১. রিলেটিভ ডেপ্রিভেশন- প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘর্ষ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের টেড রবার্ট গুররের ‘রিলেটিভ ডেপ্রিভেশন থিওরি’ অনুযায়ী, বিদ্রোহ বা গণআন্দোলন সাধারণত শুধু দারিদ্র্য থেকে হয় না, বরং মানুষ যখন তাদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক অনুভব করে তখন বিস্ফোরণ ঘটে।
বাংলাদেশে:
• শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ও হতাশা,
• ডিজিটাল সংযোগ,
• বৈশ্বিক রাজনৈতিক সচেতনতা,
• কর্মসংস্থান ও অংশগ্রহণের প্রত্যাশা,
• রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট, এবং
• ২০১৭ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের স্মৃতি
এই সব মিলিয়ে ছাত্রসমাজের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ জমা হতে থাকে। অনেক সময় একটি ছোট ঘটনা বা মন্তব্যই ‘ট্রিগার ইভেন্ট’ হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসে প্রায় সব গণঅভ্যুত্থানেই দেখা যায়, আগুন আগে থেকেই ছিল। স্ফুলিঙ্গ শুধু বিস্ফোরণ ঘটায়।
১. রাষ্ট্রীয় দমন কেন উল্টো ফল দিল- পলিটিকাল ব্যাক ফায়ার ইফেক্ট
২০২৪ সালের জুলাইতে ছাত্র প্রতিবাদ/আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার ফলে ভয় সৃষ্টির বদলে জনরোষ বৃদ্ধি পায়। এটিকে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে ‘ব্যাক ফায়ার ইফেক্ট’ বলা হয়।
দেখা গেছে যখন:
• নিহতদের সংখ্যা বাড়ে
• সাধারণ মানুষ ঘটনাকে অন্যায় হিসেবে দেখতে শুরু করে
• শহীদ বা আত্মত্যাগের প্রতীক তৈরি হয়
• এবং রাষ্ট্র অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে
তখন ‘রিপ্রেশন’ উল্টো ‘রেজিমের’ বিরুদ্ধে ‘মোরাল আউটরেজ’ সৃষ্টি করে। তখন সাধারণ জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। একপর্যায় শাসন নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে করে। ফলে পতন ঘটে বা পালিয়ে যায়।
এটি দেখা গেছে:
• ১৯৮৯ সালে ‘রোমেনিয়ান রেভ্যুলুশনে’ নিকোলাই চসেস্কুর বিরুদ্ধে,
• ফিলিপাইনে ‘পিপল পাওয়ার রেভ্যুলুশনে’
• আরব বসন্তকালে
• এবং শ্রীলংকায় রাজাপাকসের পতনে
প্রথমদিকে সরকারগুলো ভেবেছিল শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন থামানো যাবে। বাস্তবে নিবর্তন নির্যাতন আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।
১. সেনাবাহিনীর ‘ডিফেকশন’ শাসনের টার্নিং পয়েন্ট
কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের টিকে থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা‘ বা কোয়েরসিভ অ্যাপারাটাস। অর্থাৎ সেনাবাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কাঠামোর ব্যবহার।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়:
(Authoritarian regimes rarely fall only because people protest; they fall when the coercive apparatus stops fully obeying.)
শুধু জনগণের প্রতিবাদের কারণে স্বৈরাচারী শাসনের পতন খুব কমই ঘটে; এর পতন হয় তখনই, যখন দমনমূলক ব্যবস্থাটি পুরোপুরি আনুগত্য করা বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে যেমনটা ঘটেছিল সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত জনতার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংঘর্ষে যায়নি, তবে সেটিই ছিল মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
এটি দেখা গেছে:
• রোমানিয়ায় চাউশেস্কুর পতনে,
• ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর পতনে,
• নেপালে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে,
• মিশরে হোসনি মোবারকের পতনেও দেখা গেছে।
• এমনকি ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের পতনেও এমনটি ঘটেছিল।
যে মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী ‘রাষ্ট্র’ ও ‘সরকার’কে এক জিনিস হিসেবে দেখা বন্ধ করে, তখন রেজিম দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
১. রিসোর্স মোবিলাইজেশন ও প্রবাসী নেটওয়ার্ক
এই আন্দোলনে বিদেশভিত্তিক সংগঠক, নির্বাসিত আমলা, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তথ্যযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্টতার বিষযটি আধুনিক সামাজিক আন্দোলনের ‘ট্রান্সন্যাশনাল এক্টিভিজম’ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
বর্তমান যুগে আন্দোলন শুধু রাস্তার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না:
• ডায়সপোরা নেটওয়ার্কস - প্রবাসী নেটওয়ার্ক,
• আন্তর্জাতিক মিডিয়া,
• মানবাধিকার সংগঠন,
• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,
• এবং বিদেশি রাজনৈতিক চাপ
এ সবকিছু আন্দোলনের সক্ষমতা বাড়ায়।
আরব বসন্তে ফেসবুক-টুইটার, ইউক্রেনের গণআন্দোলনে প্রবাসী নেটওয়ার্ক, এবং শ্রিলংকার অর্থনৈতিক সংকটকেন্দ্রিক আন্দোলনেও এই বৈশ্বিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১. ‘ওভারসেন্ট্রালেইজেশন’ ও ব্যক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের ঝুঁকি
দীর্ঘ শাসনে একটি সাধারণ সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে ব্যক্তি শক্তিশালী হয়ে ওঠা। যখন:
• দল রাষ্ট্রের সঙ্গে মিশে যায়,
• প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারায়,
• বিকল্প নেতৃত্ব নির্মূল হয়,
• এবং সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়,
তখন রাষ্ট্র “অভিযোজন ক্ষমতা” হারায়। অর্থাৎ সংকট এলে নিজেকে সংশোধনের আর ক্ষমতা থাকে না।
নিকোলাই চসেস্কু, সুহার্তো, ফার্ম্যান্স মার্কোস। সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিনির্ভর শাসন বাইরের দিক থেকে শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
৭. ‘৩৬ জলাই’- রাজনৈতিক স্মৃতি ও বিপ্লবী প্রতীক
বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনটি ছিল একটি ভিন্ন ধরনের বিপ্লব। এটি ছিল না কোনো সামরিক অভ্যুত্থান, না ছিল রাজনৈতিক কোনো সংগ্রাম। এটি ছিল শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ- যা সাধারণ মানুষের একটি স্বতঃস্ফূর্ত, সুসংগঠিত গণআন্দোলনে রূপ নেয় যা সময়, বয়ান, ও ডিজিটাল সংযোগকে অস্ত্র বানিয়ে গড়ে উঠেছিল। হাসিনার পতন ঘটাতে দেশের মানুষ যখন রাজপথে জড়ো হয়, তখন সময়টি হয়ে ওঠে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই’র মধ্যে রেজিম পতন ঘটাতেই হবে—এমন একটি থিমকে বাস্তবে রূপ দিতে আন্দোলনকারীদের ওপরে মনস্তাত্বিক চাপ প্রয়োগ করতেই অত্র লেখক জুলাই মাসের সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা করেন দেশের বাইরে থেকে - “জুলাই মাস টেনে দেয়া হলো বিজয় অবধি- আজ ৩২, কাল ৩৩ তারিখ...এভাবে বিজয়ে গিয়ে শেষ হবে মুক্তির ক্যালেন্ডার!” যা পরে পূর্ণতা পায় ‘৩৬ জুলাই’ তে।
এই তারিখটি হয়তো কোনো ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি চিরস্থায়ী এক প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে। ৩৬ জুলাই প্রমাণ করে, জনগণের ইচ্ছা উপেক্ষিত হলে তারা সময়কেও নতুনভাবে লেখে। যখন বাস্তব সময় আর ইতিহাস সাড়া দেয় না, তখন মানুষ নিজস্ব ক্যালেন্ডার তৈরি করে। ৩৬ জুলাই কোনো তারিখ নয়, ছিল একটি বার্তা: “আমরা থামবো না, যতক্ষণ না পরিবর্তন আসে”।
বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান প্রায়ই নতুন প্রতীক, নতুন ভাষা, নতুন তারিখ তৈরি করে। যেমন:
• ফ্রান্স রেভ্যুলুশনে নতুন ক্যালেন্ডার
• ইরানীয়ান রেভ্যুলুশনে শহীদ সংস্কৃতি
• আরব বসন্তে “তাহরির স্কোয়ার”
• শ্রীলঙ্কায় “গোটা গো হোম”
এগুলো কেবল স্লোগান নয়: কালেক্টিভ পলিটিক্যাল মেমোরি তৈরির অংশ। বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জ সংগ্রামে “৩৬ জুলাই”–ছিল রাজনৈতিক প্রতীকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
৮. সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ: রাষ্ট্র, শ্রেণি ও আধিপত্য
সমাজতান্ত্রিক বা মার্কসবাদী বিশ্লেষণে রাষ্ট্রকে প্রায়ই রুলিং ক্লাস ডমিনিশনের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়:
• ক্ষমতা, পুঁজি, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একধরনের জোট গড়ে উঠেছিল,
• রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগে বৈষম্য বাড়ছিল,
• তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল,
• এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত হচ্ছিল।
আন্তোনিও গ্রামসির “হেজিমনি” তত্ত্ব অনুযায়ী, শাসন শুধু শক্তি দিয়ে চলে না; জনগণের সম্মতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব দিয়েও চলে। যখন সেই ‘হেজিমনিক কানছেনসাছ’ ভেঙে যায়, তখন রেজিম সংকটে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জনগণের বড় অংশ মনে করেছিল যে:
• একের পরে এক নির্বাচন অর্থহীন,
• প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ নয়,
• মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত,
• সীমাহীন রাষ্ট্রীয় লুটপাট,
• বলপ্রয়োগ, গুম খুন করে বিরোধীদের নির্মূল,
• এবং রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে,
সেটি হেজিমনি ক্রাইসিস ফর্মুলায় পড়ে।
সার কথা
ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো দীর্ঘমেয়াদি শাসন টিকিয়ে রাখতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল সেগুলোই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক বৈধতা, অংশগ্রহণ, প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য, এবং ডিসেন্টের জন্য নিরাপদ জায়গা না থাকলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
রোমানিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, আরব বসন্ত, শ্রীলঙ্কা সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে:
এর সমন্বয় “রেজিম চেঞ্জ” ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশের ঘটনাও সেই বৃহত্তর বৈশ্বিক রাজনৈতিক ধারার আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়, যেখানে আধুনিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর নির্ভর করলেও শেষ পর্যন্ত বৈধতার সংকটে পড়ে যায় যখন জনগণের একটি বড় অংশ আর শাসনকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করে না।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব