সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ০৮:৪১ এএম
আপডেট : ২২ মে ২০২৬ ০৯:৩৯ এএম
প্রতীকী ছবি
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো তথ্য। পুলিশ বলছে, বিকৃত যৌনলালসা চরিতার্থ করার পর অপরাধের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। আলামত গোপন এবং মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ঘাতক। অথচ ওই সময় ঘাতকের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েকে খুঁজছিলেন অসহায় মা। ছোট্ট শিশু রামিসার ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। যে বয়সে একটি শিশু স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখে, সেই বয়সেই রামিসাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে এক নরপিশাচের হাতে। এই মৃত্যু কেবল একটি শিশুর মৃত্যু নয়, এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, নৈতিকতা এবং মানবিকতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি, বিবেকের পরাজয়।
রামিসার বাবা-মায়ের কান্না ও ক্ষোভ যেন প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কণ্ঠস্বর। একজন বাবা যখন বলেন, ‘আমার মেয়েটা কী অপরাধ করেছিল’? তখন সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্যি কারও আছে বলে মনে হয় না। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে শিশুরা পর্যন্ত নিরাপদ নয়। সামাজিক মূল্যবোধে এতটাই অধোগতি হয়েছে, যে কতিপয় মানুষের কর্মকাণ্ড হিংস্র জন্তু-জানোয়ারকেও হার মানাচ্ছে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি বহুতল ভবনে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রামিসা স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার দিন সকালে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল পরিবার। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে শিশুটির মা পাশের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান। তিনি ওই ফ্ল্যাটে বারবার দরজায় নক করতে থাকেন। ঠিক সেই সময় ফ্ল্যাটের ভেতরে চলছিল হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় রামিসার মস্তকবিহীন দেহ। পরে বাথরুমের একটি বালতির ভেতর থেকে পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা। ঘটনায় ব্যবহৃত ধারালো ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি নিছক কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ভয়ংকর মানসিক বিকৃতি ও পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ উদাহরণ। বুধবার এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আদালতে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
আদালতে দেওয়া ধর্ষকের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে একজন উন্মত্ত হায়েনার হরিণ শাবকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চিত্র। কতটা বিকৃত মানসিকতা ও হিংস্র হলে একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর মানুষ হিসেবে পরিচিত কেউ এমন পাশবিকতা চালাতে পারে তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। ভয়ংকর সত্য হলো, এ ধরনের অপরাধ এক দিনে জন্ম নেয় না। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, নারীর প্রতি অবমাননা, মাদক, পর্নোগ্রাফির অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব অপরাধকে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দেয়। যখন অপরাধীরা দেখে ক্ষমতা, অর্থ বা প্রভাবের কারণে অনেকে শাস্তি এড়িয়ে যায়, তখন তাদের ভয় কমে যায়, বিবেক মরে যায়। আমরা এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার পর সাময়িক প্রতিবাদ করি সত্য, কিন্তু স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই। আছিয়া, রামিসা কিংবা আরও অসংখ্য শিশুর নাম কিছুদিন আলোচনায় থাকে, পরে হারিয়ে যায় নতুন ঘটনার ভিড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন থামছে না?
সমাজে এখন সবচেয়ে বড় সংকট মানবিকতার। শিশুরা আজ ঘরের বাইরে তো নয়ই, অনেক সময় ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা এসব খবর যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ কোনো সমাজ যখন অন্যায়ের প্রতি অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে অমানবিক হয়ে ওঠে।
আসলে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দিন দিন যেভাবে বাড়ছে, তার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা নিঃশঙ্কচিত্তে অপরাধে প্রবৃত্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। গত বছর মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়ার নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। মানুষ রাস্তায় নেমে বিচার দাবি করেছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই মামলা এখন আপিলে ঝুলে আছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষকে দায়িত্ব নিতে হবে। একজন শিশুর নিরাপত্তা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব।
এ কথা সত্যি যে, রামিসা আর কখনও ফিরে আসবে না। কিন্তু তার এই করুণ মৃত্যু একটি বড় প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে এ সমাজে শিশুরা নিরাপদ হবে কবে? আজ রামিসার জন্য শুধু শোক জানিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। আর কোনো রামিসাকে যেন মানুষ নামের কোনো পশুর হিংস্রতার শিকার হতে না হয়, সে নিশ্চয়তাও সৃষ্টি করতে হবে।