শাহাদাত হোসেন সেলিম। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি বৈষম্যহীন, আত্মমর্যাদাশীল ও কল্যাণমূখী রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের মনে জেগেছে, তা বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়। রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তা পরিমাপ করা হয় রাষ্ট্রের জন্য যারা অবদান রাখছেন তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, তার ওপর ভিত্তি করে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই আজ আমি সরকারের কাছে এবং দেশের সুধীসমাজের সামনে অত্যন্ত যৌক্তিক, সময়োপযোগী ও মানবিক একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই। তা হলো, সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের প্রবীণ বয়সে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা বা লয়্যালটি পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার এই ব্যক্তিগত ভাবনাটি শেয়ার করার পর বহু মানুষের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া ও সমর্থন পেয়েছি। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের সচেতনমহল এটিকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনার তাগিদ দিয়েছেন। একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সুসংবাদ হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান চেয়ারম্যান, আমার নির্বাচনী এলাকারই সন্তান ও ঘনিষ্ঠ স্বজন আব্দুর রহমান খান মহোদয়ের সাথে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ, সৎ এবং আধুনিক চিন্তার মানুষ। আমার এই মানবিক প্রস্তাবটি শুনে তিনি কেবল জোরালো সমর্থনই ব্যক্ত করেননি, বরং বর্তমানে আয়করদাতাদের প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে যে বিশেষ কমিটি কাজ করছে, তাদেরকে অবিলম্বে নির্দেশ দিয়েছেন এটি কীভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় বাস্তবায়ন করা যায় তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে। সৎ করদাতাদের মূল্যায়নের এই ত্বরিত ও ইতিবাচক উদ্যোগের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়কে আমি আমার এবং দেশের করদাতাদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। ওনার এই দূরদর্শী চিন্তা ও অক্লান্ত পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়।
আজ এই কলামের মাধ্যমে বিষয়টি আমি নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের কাছে আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে চাই।
বাস্তবতার নিরিখে আমাদের কর সংস্কৃতি
আমরা সবাই জানি, সরকারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো আয়কর যা মূলত ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং পেশাজীবীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করলে যত মানুষের কর দেওয়া উচিত, তত মানুষ কর দেন না। অনেকেই নানা কৌশলে কর ফাঁকি দেন। এর একটা বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই এই আক্ষেপ কাজ করে যে, ‘আমি রাষ্ট্রকে এত কষ্টার্জিত অর্থ কর হিসেবে দিয়ে বিনিময়ে কী পাচ্ছি?’
আমি আজ নিজের অফিসেরই একটি হিসাব নিই। একজন ব্যবসায়ী ও নাগরিক হিসেবে আমি এ যাবৎ রাষ্ট্রকে ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা আয়কর এবং প্রায় ৪৩ কোটি টাকা ভ্যাট প্রদান করেছি। আমার মতো দেশের হাজারো নাগরিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বা যৌবনের দিনগুলোতে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একজন করদাতার বয়স যখন ৬৫ বছর বা তার বেশি হয়, যখন তার কর্মক্ষমতা কমে যায়, চিকিৎসার খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়ে এবং নিয়মিত আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে আসে তখন রাষ্ট্র তার জন্য কী করছে? বাস্তবতা হলো, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদ্যোগ-অবদান প্রায় শূন্যের খাতায়।
প্রস্তাবিত নীতি : ‘সৎ করদাতা পেনশন ও সম্মাননা নীতি’
আমার প্রস্তাবটি অত্যন্ত সরল ও মানবিক। কর্মজীবনে যারা বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে নিয়মিত বড় অঙ্কের আয়কর দিয়ে গেছেন, প্রবীণ বয়সে এসে সেই জমাকৃত আয়করের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ কি রাষ্ট্র তাদের সম্মানী বা প্রণোদনা হিসেবে ফেরত দিতে পারে না? এটি হতে পারে প্রবীণ বয়সে একটি ‘রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা’ কিংবা সৎ করদাতার প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান জানানো; যা অপরাপর নারিকদের কর দানে উৎসাহিত করবে। এই সুবিধাটি আজীবন বা সর্বোচ্চ ২০ বছরের জন্য নিশ্চিত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার সামর্থ অনুযায়ী পেনশন বা সম্মানির অংক নির্ধারণ করবে। তবে সে অংক সবার ক্ষেত্রে সমপরিমাণ হতে হবে। যাতে এমনটি মনে হয়না, রাষ্ট্র বৈষম্য করছে।
একটি সহজ গাণিতিক হিসাব দেওয়া যাক। একজন নাগরিক যদি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্রকে ২০ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে থাকেন, জীবনের শেষ অপরাহ্ণে এসে সরকার যদি তাকে প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেয়, তবে ২০ বছরে সরকারের মোট খরচ হবে মাত্র ৬০ লাখ টাকা। মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলেও তা হয়তো সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। যে নাগরিক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ৪০টি বছর বিলিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে ২০ কোটি টাকা দিল, জীবনের শেষ বয়সে ২০ বছরে তার ১ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া কি রাষ্ট্রের কাছে খুব বড় চাওয়া? এটি সরকারের জন্য কোনো বড় আর্থিক বোঝা হবে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্র চাইলে এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে ‘সৎ করদাতা পেনশন ও সম্মাননা নীতি’ প্রণয়ন করতে পারে।
আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি এই জ্যেষ্ঠ ও সৎ করদাতাদের বিশেষ নাগরিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে; যেমন- সুপার শপ, যাতায়াত (বিমান/ট্রেন/বাস) এবং হাসপাতালে চিকিৎসায় বিশেষ ছাড় বা অগ্রাধিকার কার্ড।
নীতির সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
যদি এই নীতিটি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় তিনটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এতে কর সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ মানুষের কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দ্রুত কমে আসকে। মানুষ কর দেওয়াকে আর ‘বোঝা’ বা ‘ক্ষতি’ মনে করবে না, বরং এটিকে প্রবীণ বয়সের একটি ‘সুরক্ষিত বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখবে। এতে করদাতার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের রাজস্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এটি হবে একটি কল্যাণমুখী পদক্ষেপ। এতে কর প্রদানের সময় মানুষের মনে অন্তত এই মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা থাকবে যে সে বৃদ্ধ বয়সে একা বা কর্মক্ষমতাহীন হয়ে গেলেও রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে, অন্তত বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হবে না।
এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে উন্নত দেশের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক উন্নত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে (যেমন-যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চল) নাগরিকরা সারাজীবন যে ট্যাক্স এবং ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স দেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রবীণ বয়সে রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র গড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই করদাতাদের জন্য এমন একটি ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ চালু করার এখনই উপযুক্ত সময়।
একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে যেকোনো যুগান্তকারী পরিবর্তনের পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি আমার সাংবাদিক বন্ধু ও দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ভাইদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাব, জনস্বার্থে এবং একটি মানবিক সমাজ গঠনে এই বিষয়টি নিয়ে আপনারা আপনাদের কলম ধরুন। আপনাদের ক্ষুরধার লেখনী, বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন এবং গঠনমূলক আলোচনা এই প্রস্তাবটিকে দ্রুত একটি জাতীয় নীতিমালায় রূপান্তর করতে সরকারকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও বেগবান করবে।
টিকা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন একটি শিশুর রোগ প্রতিরোধের প্রথম দেয়াল, ঠিক তেমনি করদাতাদের দেওয়া রাজস্ব রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রথম দেয়াল। আর প্রবীণ বয়সে সেই করদাতার পাশে দাঁড়ানো হলো একটি মানবিক রাষ্ট্রের শেষ দেয়াল। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি প্রকৃত কল্যাণকামী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গঠনে যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখি। নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ে ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।