রেনেসাঁ থেকে বিশ্বায়ন
কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে মানুষ নিজের পরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। কখনও ধর্মের ছায়া ভেদ করে যুক্তির আলোয়, কখনও সাম্রাজ্যের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায়, আবার কখনও বিশ্বায়নের রঙিন মোহে আত্মপরিচয়ের সংকটে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ, বাংলার নবজাগরণ, ঔপনিবেশিকতার সাংস্কৃতিক রাজনীতি, প্রাচ্য-প্রতিচ্যের দ্বন্দ্ব, এবং উত্তরাধুনিক চিন্তার উত্থান-সব মিলিয়ে মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ আত্মসমালোচনার ইতিহাস রচিত হয়েছে।
চতুর্দশ থেকে
ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় রেনেসাঁ ছিল মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মানববুদ্ধির
পুনর্জাগরণ। গির্জাকেন্দ্রিক সমাজে মানুষ ছিল ভাগ্যের বন্দী; রেনেসাঁ মানুষকে শিখিয়েছিল-'মানুষই
তার ভাগ্যের নির্মাতা।'
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি শিল্পকে বিজ্ঞান ও কল্পনার মিলনে এক নতুন মাত্রা দেন।উইলিয়াম শেক্সপিয়ার মানুষের অন্তর্জগতকে নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। ডেনটি আলিঘেরি ধর্মীয় প্রতীকের ভেতর মানবিক বেদনার ভাষা খুঁজে পান। আর নিকলো ম্যাচিভ্যালি রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে ধর্মীয় নীতির বাইরে এনে বাস্তবতার কঠিন আলোয় বিশ্লেষণ করেন।
এই রেনেসাঁ
কেবল শিল্প-সাহিত্যের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল “মানুষ” নামক সত্তার পুনর্জন্ম
ইউরোপীয় রেনেসাঁর
বহু শতাব্দী পরে বাংলায় নবজাগরণ আসে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। এখানে নবজাগরণ ঘটেছিল ঔপনিবেশিক
শাসনের ছায়ার ভেতর। ফলে এটি একই সঙ্গে মুক্তির আন্দোলন এবং এক সাংস্কৃতিক দ্বৈততার
জন্ম দেয়।
রাজা রামমোহন
রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যুক্তিবাদী সমাজচিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেন। তিনি
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়তে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে হেনরি
লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও তরুণ সমাজকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর 'ইয়ং বাংলা' আন্দোলন
ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহের প্রতীক।
বাংলার নবজাগরণ
তাই নিছক অনুকরণ ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয় খোঁজার সংগ্রাম। তবে এই নবজাগরণে এক ধরনের সাংস্কৃতিক
বিভাজনও জন্ম নেয়-যেখানে ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
প্রাচ্য দীর্ঘকাল
আত্মা, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা ও সমষ্টিগত চেতনাকে গুরুত্ব দিয়েছে; প্রতিচ্য জোর দিয়েছে
ব্যক্তি স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ ও বস্তুবাদী অগ্রগতিতে।
একদিকে উপনিষদের
'তত্ত্বমসি', অন্যদিকে রেনে ডিসক্যারেটস এর উক্তি হচ্ছে- আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি-দুই
সভ্যতার দুই ভিন্ন আত্মদর্শন।
পাশ্চাত্য আধুনিকতা
প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিস্ময়কর উন্নতি এনেছে; কিন্তু একই সঙ্গে ঔপনিবেশিকতা,
বিশ্বযুদ্ধ ও ভোগবাদও সৃষ্টি করেছে।
প্রাচ্য মানবিক
ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার রক্ষা করেছে; কিন্তু বহুক্ষেত্রে কুসংস্কার ও স্থবিরতার শিকারও
হয়েছে।
এই দ্বৈরথ
আজও শেষ হয়নি; বরং বিশ্বায়নের যুগে এটি আরও জটিল হয়েছে
ব্রিটিশ লেখক
রুডইয়ার্ড কিপলিং তাঁর বিখ্যাত কবিতা ' সাদাদের বোঝা' এ উপনিবেশবাদকে 'সভ্যতা দানের
দায়' হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এই ধারণা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদকে নৈতিক বৈধতা দেয়।
উপনিবেশবাদীরা
দাবি করত-তারা প্রাচ্যকে শিক্ষা, সভ্যতা ও আধুনিকতা দিচ্ছে। বাস্তবে তারা সম্পদ লুণ্ঠন,
সংস্কৃতি দমন ও মানসিক দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
ভারতবর্ষে রেললাইন
নির্মিত হয়েছিল বাণিজ্য ও শাসন সহজ করার জন্য; শিক্ষা ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছিল এমন এক
শ্রেণি তৈরির জন্য, যারা “রক্তে ভারতীয় কিন্তু চিন্তায় ইংরেজ।'
ঔপনিবেশিকতা
তাই শুধু রাজনৈতিক শাসন ছিল না; এটি ছিল ভাষা, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার
প্রকল্প।
এডওয়ার্ড সাঈদ
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ওরিয়েন্টালিজমে এ দেখান, পাশ্চাত্য কিভাবে 'প্রাচ্য' কে রহস্যময়,
পশ্চাৎপদ ও দুর্বল হিসেবে নির্মাণ করেছে, যাতে তাকে শাসন করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য
মনে হয়।
সাঈদের মতে, জ্ঞানও
এক ধরনের ক্ষমতা। ইউরোপীয় সাহিত্য, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি-সবখানেই প্রাচ্যকে এমনভাবে
উপস্থাপন করা হয়েছে যেন পশ্চিমা আধিপত্য স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়।
আজও আন্তর্জাতিক
গণমাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক সময় সংকট, সহিংসতা ও পশ্চাৎপদতার
প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়-যা সাঈদের বিশ্লেষণকে সমকালেও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
সালমা রুশদী তাঁর
উপন্যাসগুলোতে অভিবাসন, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও পরিচয়ের সংকটকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন।
মিডনাইট চিলড্রেন
-এ ভারত বিভাগের ইতিহাস যেন এক ভাঙা আয়না; আর দ্য স্যটানিক ভার্সেস বিশ্বায়নের যুগে
বিশ্বাস, ভাষা ও পরিচয়ের সংঘর্ষকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করে।এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধকেও
কুৎসিতভাবে কটাক্ষ করা হয়।
রুশদীর লেখায়
মানুষ যেন দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে-না পুরোপুরি প্রাচ্যের, না পুরোপুরি পাশ্চাত্যের।
ফুকো, দেরিদা
ও উত্তরাধুনিকতার প্রশ্ন
Michel
Foucault দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনীর হাতে থাকে না; জেলখানা, হাসপাতাল,
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ভাষার মধ্যেও ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে।
তাঁর বিশ্লেষণে
আধুনিক সভ্যতা অনেক সময় মুক্তির চেয়ে নিয়ন্ত্রণের নতুন কৌশল তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ‘Jacques
Derrida 'Deconstruction' এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অর্থ ও সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর
মতে, কোনো পাঠের একক ও চূড়ান্ত অর্থ নেই।
এই চিন্তাবিদেরা
দেখিয়েছেন-সভ্যতা যাকে “সত্য” বলে প্রতিষ্ঠা করে, তার পেছনেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক
শক্তি কাজ করে।
বিশ্বায়ন:
সংযোগ নাকি সাংস্কৃতিক সমরূপতা?
আজকের বিশ্বায়ন পৃথিবীকে প্রযুক্তিগতভাবে একত্র করেছে। Google, Meta কিংবা Netflix-এর যুগে তথ্য মুহূর্তেই বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই বিশ্বায়ন কি সত্যিই সমতার পৃথিবী তৈরি করেছে?
বিশ্বায়ন একদিকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের নতুন দুয়ার খুলেছে; অন্যদিকে এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় পরিচয়কে সংকুচিতও করছে। ছোট সংস্কৃতিগুলো অনেক সময় বৈশ্বিক পুঁজিবাদের প্রবল স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমে 'বিশ্বনাগরিক' হলেও অনেকেই নিজের শিকড় হারানোর আতঙ্কে ভুগছে।
উপসংহার: আত্মপরিচয়ের
নতুন সন্ধান
রেনেসাঁ মানুষকে মুক্ত চিন্তার শিক্ষা দিয়েছিল; ঔপনিবেশিকতা সেই চিন্তাকে আধিপত্যের অস্ত্রে পরিণত করেছিল; উত্তরাধুনিকতা আবার সেই আধিপত্যকে প্রশ্ন করেছে। আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে মানুষ simultaneously সংযুক্ত এবং বিচ্ছিন্ন-অত্যন্ত আধুনিক অথচ গভীরভাবে অনিশ্চিত।
প্রাচ্য ও
প্রতিচ্যের সংঘাত তাই কেবল ভূগোলের সংঘাত নয়; এটি স্মৃতি ও আধুনিকতা, আত্মা ও প্রযুক্তি, ঐতিহ্য
ও বাজারের দ্বন্দ্ব।
সম্ভবত ভবিষ্যতের
মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে-কিভাবে আমরা প্রযুক্তির গতি, যুক্তির দীপ্তি এবং
মানবিক আত্মার গভীরতাকে একসাথে ধারণ করতে পারি। কারণ সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব,
যখন মানুষ কেবল আধুনিক হবে না-মানবিকও হবে।
কাজী জিয়া
উদ্দিন
অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি