ইংরেজি ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান দ্য কিউর’-এর বাংলা তরজমা হলোÑ ‘নিরাময়ের চেয়ে নিবারণ উত্তম’। অর্থাৎ শারীরিক ব্যাধি হোক কিংবা সামাজিক সমস্যা, তা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই রোধ করা ভালো। এজন্য প্রয়োজন আগাম সতর্কতা। পূর্বাহ্ণে প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সমস্যা কখনোই ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে না। সম্প্রতি হামে পাঁচ শতাধিক শিশুর করুণ মৃত্যু সে কথারই প্রতিধ্বনি করছে। বিগত সরকারের সময়ে হামের টিকা সময়মতো আমদানি না করা এবং কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে শিশুদের সেই টিকা দিতে না পারার ফলে এবার তা মহামারির রূপ নিয়ে দেশব্যাপী আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সরকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্বাস্থ্য খাতের এই বিপর্যয় সচেতন ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলেছে। হামের মতো একটি মারাত্মক শিশুরোগের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এ নিস্পৃহ ভূমিকা এখন তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে। সমালোচনা ও নিন্দা যতই হোক, যে শিশুরা হামের আগ্রাসনে প্রাণ হারিয়েছে, তারা আর কখনও ফিরে আসবে না। শিশুহারা মায়ের শূন্য কোল আর পূরণ হবে না। এখন আলোচনা হচ্ছে এজন্য কে বা কারা দায়ী। হয়তো পর্যালোচনায় দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজেও পাওয়া যাবে। তবে কর্তব্যে অবহেলাজনিত অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না তা দেশবাসীর অজানা। আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা-দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সব সময় যেটা দেখা যায়, এ ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটবে। একটি তদন্ত কমিটি হবে ‘বিশেষজ্ঞ’দের নিয়ে। তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হবে। কিন্তু সে তদন্ত প্রতিবেদন আর কখনোই আলোর মুখ দেখবে না। এভাবেই চলে আসছে যুগের পর যুগ। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে যায়।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। প্রতিদবেদনটিকে ডেঙ্গু সম্পর্কে
আগাম সতর্কবার্তা বলে ধরে নেওয়া যায়। কেননা, তাতে কেন কীভাবে ডেঙ্গু মহামারি আকারে
ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি
বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে
২ হাজার ৯৩১ জন। মৃত্যু ঘটেছে পাঁচজনের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের
৫৬টি জেলায় ইতোমধ্যে ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে ডেঙ্গুর এ বিস্তার তাই
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কিত করে তুলেছে। তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, পূর্বাহ্ণে
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে বর্ষায় এ রোগ মহামারির আকার ধারণ করতে পারে।
হাল আমলে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করলেও রোগটি পৃথিবীতে নতুন নয়। মশাবাহিত
এ রোগটির উৎপত্তি চীনে ২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এরপর ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের
প্রথম দশকে আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকায় প্রায় কাছাকাছি সময়ে এর জ্বরের প্রাদুর্ভাব
দেখা দেয়। ১৯০৬ সালে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, ‘এডিস ইজিপ্টাই’ নামের এক ধরনের মশা
এই রোগের বাহক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেঙ্গু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মহামারি রূপে ছড়িয়ে
পড়ে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর ৫ হাজার
৫৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং সরকারি হিসাব মতে ৯৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। এরপর প্রতিবছরই
ডেঙ্গুর প্রকোপে দেশে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা সৃষ্টি হয়
২০১৯ সালে। সে বছর সারা দেশে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন এবং মারা যায় ১৭৯ জন।
২০২০ সালে আক্রান্ত হয় ১ হাজার ৪০৫ জন, মারা যায় ৭ জন। ২০২১ সালে আক্রান্ত ২৮ হাজার
৪৩২ জন, মারা যায় ১০৫ জন। ২০২২ সালে আক্রান্ত ৬২ হাজার ৩৮২ জন, মৃত্যু ২৮১ জনের। ২০২৩
সালে আক্রান্ত হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৯৮ জন, মৃত্যু ঘটে ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত
হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মারা যায় ৫৭৫ জন।
উপরিউক্ত পরিসংখ্যান থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে
বিগত সরকারগুলো উচ্চ নিনাদে হাঁকডাক করলেও কার্যত তারা তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি।
ওই সময় ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রদের বাড়ি বাড়ি ডেঙ্গু তল্লাশি ও লার্ভা পাওয়া গেলে
বাড়ির মালিক বা বাসিন্দাদের জরিমানার নাটকও দেশবাসী দেখেছে। এসব নাটকের আড়ালে ব্যর্থতাকে
ধামাচাপা দেওয়ার পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রন কার্যক্রমের নামে অর্থ লোপাটের মচ্ছবের
অভিযোগ রয়েছে। মশা মারতে কামান দাগলেও মশার পাখাও তারা স্পর্শ করতে পারেননি। এমনকি
সিটি করপোরেশনের এক কর্তাব্যক্তি ‘দক্ষিণে ওষুধ ছিটালে মশা উত্তরে যায়, আবার উত্তরে
অভিযান চালালে মশা দক্ষিণে হিজরত করে’ বলে অভিনব তত্ত্ব দিয়েছিলেন। এ নিয়ে তখন হাস্যরোল
সৃষ্টি হয়েছিল।