মাজারে হামলার চেষ্টা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ অলি-আউলিয়ার দেশ। এখানে হাজার বছর যাবৎ চলে আসছে সুফি ধারা। বাংলাদেশের বিভিন্ন দরবার, মাজারে লক্ষকোটি ভক্ত আসা-যাওয়া করেন। এই অঞ্চলে মাজার, মন্দির, সুফি, সাধুদের নিয়ে সমাজে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, মত ও পথের ফারাক থাকলেও এই নিয়ে সংঘর্ষ বা আক্রমণের মতো ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর উগ্র সাম্প্রদায়িক একটি গোষ্ঠী হঠাৎ করে মাজার, দরবার, বাউল গানের আসরের ওপর হামলা, সুফি-সন্ন্যাসীদের খুন করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে একের পর এক। আর এই সুযোগে রাষ্ট্রবিরোধী অংশও বাংলাদেশের জনগণের মাঝে ধর্মীয় বিভক্তি আরও বেশি বৃদ্ধি করে হয়তো বাংলাদেশটাকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। মাজারে, দরবারে হামলা, সুফি ও সন্ন্যাসীকে হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলা ধর্মের নামে জনগণকে ভাগ করার নতুন ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। যার সর্বশেষ শিকার প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মিরপুর মাজারে হামলা। রাজধানীর মিরপুরে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে হামলার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের ওপর চলমান চাপের আরেকটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
মাজার, দরবার, খানকা, আখড়া বা সাধকদের স্মৃতিস্থানÑ এগুলোকে কেবল
‘কবরপূজা’ বা ‘কুসংস্কার’ বলে উড়িয়ে দেওয়া বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের আত্মিক
জীবনকে অস্বীকার করা ও অপমান করা। সাধারণ মানুষ শত শত বছর ধরে মাজারকে শুধু ধর্মীয়
স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে না, তারা এগুলোকে দেখে আশ্রয়, দোয়া, মিলন, খাদ্য, মুসাফিরি,
গান, কান্না, স্মৃতি, প্রতিবাদ ও দরিদ্র মানুষের মর্যাদার স্থান হিসেবে।
আমাদের দেশে ছোট-বড় অনেক মাজার রয়েছে। সব মাজারেই আগত লোকজনের মধ্যে
একটা বিশ্বাস কাজ করে। কারও মধ্যে সেই বিশ্বাস নাও থাকতে পারে। যার বিশ্বাস নাই সে
যাবে না। কিন্তু যাদের আছে, তাদের কেউ বাধা দেবেন কোন যুক্তিতে? অথচ সেই কাজটাই প্রায়
দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে। কেউ মাজারে যাবে কি যাবে না, পীর মানবে কি মানবে
না, উরস করবে কি করবে নাÑ এটা বিশ্বাস, বিবেক ও সামাজিক চর্চার বিষয়। কিন্তু কেউ যদি
রাষ্ট্র, প্রশাসন বা পুলিশের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মাজার-বিরোধী উস্কানি দেয়, তাহলে সেটা আর
নিছক ধর্মীয় মতভেদ থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী আচরণ, সেটা ক্ষমতার ভাষা
হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের কাজ কোনো বিশেষ মাজহাব, তরিকা বা ধর্মীয় মতকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে
দেওয়া নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের জান-মাল, ইবাদত, স্মৃতি, কবরস্থান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষা করা।
মাজারে যারা যান তারা একটি বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে যান। কিছু ধান্দাবাজ
যে যান না, তা নয়। সে রকম ধান্দাবাজরা তো মসজিদেও যান, মাদ্রাসায়ও দান করেন। কিন্তু
মূলত যারা মাজারে যান, তারা একটা প্রবল বিশ্বাস নিয়েই যান। তাদের চোখমুখে সে বিশ্বাস
পড়া যায়। এ বিশ্বাসকে কেউ উপেক্ষা করতে পারেন? ২০২৪-এর আগস্টে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই মাজারবিরোধীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এক হিসাবে
দেখা যায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে একশর মতো মাজারে
আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা হয়েছে। এই সময়টা ছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল।
একটা পরিবর্তন বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা মাজারের ওপর
হামলাগুলোকে যেমন প্রতিরোধ করেনি, তেমনি তারা হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত
করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টাও করেনি। তারা এগুলো হতে দিয়েছে। কেবল মাজারই নয়, দেশজুড়ে
থাকা বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা হয়েছে।
বাউল গানের অনুষ্ঠানগুলোতে হামলা করে ভন্ডুল করে দেওয়া হয়েছে। সেই
সময়টাকে মাজার বা মাজারপন্থিদের ওপর হামলায় সরকার যখন চুপ থেকেছে, তার কোনো প্রতিবাদ
করেনি দেশের দুয়েকটি দল ছাড়া রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এই দলগুলোর
কেউই। আর আশকারা পেয়ে দুর্বৃত্তরা এই ভূখণ্ডে যে অপকর্ম কখনোই ঘটেনি, সেই সেটাও করে
দেখিয়েছে। কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে তারা। নিরুদ্বিগ্ন সরকার সেটাও
চেয়ে চেয়ে দেখল, কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিল না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে নির্বাচন
হলো। একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো, সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলো। তাহলে এখন কেন মিরপুরে
শাহ আলীর (রহ.) মাজারে হামলা হয়? এখন প্রশ্ন, এই যে গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মাজারের
ওপর হামলা, এটা কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ?
রাজধানীর মিরপুরে ঐহিত্যবাহী হজরত শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে
গভীর রাতে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের আগেই রাজনৈতিক দোষারোপ চলছে। স্থানীয়দের
কেউ কেউ হামলায় জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন; পুলিশও ‘তাদের
কিছু লোক থাকতে পারে’ বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে দলটি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হামলাকারী যে-ই হোক, শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে, পুলিশের গাড়ি মাজারের
বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেন তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ হলো না? রাষ্ট্রের উপস্থিতি যদি কেবল দর্শকের
মতো হয়, তবে জনতার হাতে বিচার প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। সমাজে বিশৃঙ্খলতা
সৃষ্টি হবে, যা সরকার ও সমাজের জন্য কোনো রকমের কল্যাণ বয়ে আনবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ও মাজার ভক্তদের ওপর হামলা প্রকৃত পক্ষে বিরুদ্ধ
মতের ওপর হামলা। মাজার ভাঙা, মাজারে হামলা, উরস বন্ধ করা, দরবারে ভয় দেখানো, পীর-মুরিদদের
অপমান করা, অথবা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ঘৃণা ছড়ানোÑ এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয়
মতভেদকে সহিংসতায় পরিণত করা ইসলামবিরোধী, গণবিরোধী এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজ। যারা মাজারকে
আক্রমণ করছে, তারা আসলে জনগণের শ্রদ্ধার স্থানে আক্রমণ করছে। এই দেশের ইসলাম মাঠে,
নদীতে, মাজারে, মসজিদে, দরবারে, মায়ের দোয়ায়, ফকিরের গানে, দরিদ্রের রুটিতে, মজলুমের
আর্তিতে গড়ে উঠেছে। মাজারে হামলা কোনো অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাদকবিরোধী
বা অন্য কোনো অভিযান যদি পরিচালনার প্রয়োজনও হয় সেই দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সেটিও
হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার
তদন্ত ও বিচার হবে আইনগত প্রক্রিয়ায়, হামলা বা ভাঙচুরের মাধ্যমে নয়। সম্প্রতি দেশের
বিভিন্ন স্থানে মাজার ও সুফি দরগায় হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ফলে হজরত শাহ আলী বাগদাদীর
(রহ.) মাজারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নাই।
মাজারে হামালার ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে, সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদেরকে সহিংসতা, উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। নীরবতা বা অস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে সমাজে ভুল বার্তা দেওয়া সঠিক হবে না। রাষ্ট্র যদি সময়মতো স্পষ্ট বার্তা না দেয়, তাহলে আজ মাজার, কাল অন্য কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিসর একই ধরনের হামলার শিকার হবে। আইনহীন জন-আক্রোশ কখনও নৈতিক সমাজ গড়ে না; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে ক্ষয় করে। শাহ আলী মাজারের ঘটনা তাই কেবল একটি রাতের সহিংসতা নয়, এটি সরকারের জন্য আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক