রেজাউল করিম। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাজধানীর পল্লবী। সাত বছরের এক শিশু রামিসা আক্তার। সে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা চাকরি করেন একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে। সতেরো বছর ধরে একই এলাকায় সংসার। স্বপ্ন ছিল, হাসি ছিল, বাঁচার অদম্য উৎসাহ ছিল।
তার সব কিছু মুছে দিতে পাশের ফ্ল্যাটের এক দম্পতির বদনজরই যথেষ্ট ছিল। নৃশংস হত্যা, তারপর মরদেহ গুমের চেষ্টা। পুলিশ গ্রেফতার করেছে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, আমরা কি শুধু অপরাধীদের শাস্তির মধ্যদিয়ে দায় শেষ করে দিতে চাই? না কি কারণ অনুসন্ধান করব?
এটি কোনো একক হত্যা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এ যেন আমাদের সমাজের আয়না। যেখানে নৈতিক অবক্ষয়ের জাল দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। পরিবার ও সমাজের বন্ধন দুর্বল। আর তার চূড়ান্ত প্রভাবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়া অশ্লীল, বিকৃত ও হিংস্র সব কন্টেন্ট আজ শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সবার মনোজগৎকে আক্রান্ত করছে।
যে বিভাগগুলো এসব নিয়ন্ত্রণ করবে বিটিআরসি, এনটিএমসি, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সেখানে কে কোন দিক তাকিয়ে আছে? তাদের সময় আর শক্তি খরচ হয় কীভাবে? কাকে খুশি করা যায়? কার কাছে প্রশংসা তোলা যায়? সঠিক কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর বোঝা হালকা করার দায়িত্বের পরিবর্তে তারা কর্মমুখর থাকেন ঠিকই, তবে অন্য এক উদ্দেশ্যে।
অথচ বাংলাদেশের চেয়ে ডিজিটাল দিক থেকে বহুদূর এগিয়ে থাকা দেশগুলোতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ইউরোপের অনেক দেশ। সেখানে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারে রয়েছে শৃঙ্খলা, সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী। সেখানে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর অশ্লীল প্রচার বা বেপরোয়া অপপ্রচার এত সহজে চোখে পড়ে না। কেন? কারণ ওই দেশগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে। তারা আইন প্রয়োগ করে, কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং সবচেয়ে বড় কথা জনস্বার্থকে নিজেদের কর্তব্যের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে স্থির করে।
আমাদের সংকট একটাই, সরকারি দপ্তরগুলোর মাঝে সঠিক কাজের বদলে তোষামোদি ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি যেন শিকড় গেড়ে বসেছে। আর সেই সংস্কৃতির প্রাণহানি হচ্ছে রামিসার মতো শিশু। আমরা প্রতিদিন যে ডিজিটাল আবর্জনার ভিড়ে পা ফেলছি, সেই আবর্জনার বীভৎস প্রতিফলন ঘটছে অলিতে-গলিতে, ফ্ল্যাটে-মহল্লায়।
এখন সময় এসেছে ডিজিটাল অনিয়মের বিরুদ্ধে জোরালো, টেকসই, ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কেবল নিয়ম মানতে নয়, নিজেদের উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। জনসচেতনতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সামাজিক আচরণের পুনর্বিন্যাস। এ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করাতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎকে।
পল্লবীর রামিসা চিরদিনের মতো চুপ করে গেছে। তার নীরব চিৎকার যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কারণ আজ যদি আমরা ডিজিটাল সংস্কৃতির ওই অন্ধকার গলিটি পরিষ্কার না করি, তাহলে আগামীকাল রামিসা একা থাকবে না, তার সাথে থাকবে আরো অগণিত নীরব মুখ। আর তখন ‘আমাদের কোনও লেখা, সম্পাদকীয়, কোনও প্রতিশ্রুতি কাজে লাগবে না’।
লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক