× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এতিমখানাটি রক্ষা করুন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১০:৪৪ এএম

এতিমখানাটি রক্ষা করুন

রাজধানীর আজিমপুরে অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী ‘স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা’ নিয়ে গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী এতিমখানাটি। যাদের দায়িত্ব এতিমদের আগলে রাখা, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা করা, তারাই গড়ে তুলেছেন একটি লুটেরা সিন্ডিকেট। রক্ষকই হয়ে উঠেছেন ভক্ষক। এতিমদের অধিকার পরিণত হয়েছে পণ্যে। অভিযোগ উঠেছে, এতিমদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালনা কমিটির একটি অংশ মিলে লুট করছে প্রতিষ্ঠানের অর্থ। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামাতে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও টিকতে পারেনি। এর সম্পদ ও অর্থ রক্ষা করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্বারস্থ হতে হয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। বিভিন্ন নথিপত্র ও দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। 

উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯০৯ সালের মার্চে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এই এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে নাম ছিল ‘ইসলামিয়া এতিমখানা’। ১৯১৩ সালের ৬ জুলাই সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইন ২১ (১৮৬০) অনুযায়ী এটি নিবন্ধিত হয়। ১৯৬১ সালের স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশের অধীনে পুনরায় নিবন্ধন পায় (নং ২১৯/৬২)। বর্তমানে এটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে এতিমখানাটি প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত কমিটি না থাকার সুযোগে একটি চক্র প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিমালিকানার আদলে পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, এতিমখানার বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর’ (আরজেএসসি) থেকে ‘স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা সোসাইটি’ নামে একটি নিবন্ধন নেওয়া হয়। নিবন্ধন নেওয়ার পর ২০২৫ সালের ৫ মার্চ ইসলামী ব্যাংক লালবাগ শাখায় দুটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। ওই অ্যাকাউন্টগুলোতে এতিমখানার সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় এবং জনসাধারণের দান-অনুদানের অর্থ জমা করা হতো। বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নজরে এলে নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা হয়। অধিদপ্তরের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল সোসাইটির নিবন্ধন বাতিল করে আরজেএসসি। বাস্তবতা এমন যে, স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা যেন আজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের নাম। যেখানে এতিম শিশুরা মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সেখানে তারা পরিণত হচ্ছে লোভের বাজারে বিক্রীত পণ্যে।

 ‘এতিমখানা’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আশ্রয়হীন শিশুদের বেঁচে থাকা ও বড় হয়ে ওঠার নির্ভরতার প্রতিষ্ঠানের ছবি। ভাগ্যের পরিহাসে সমাজ ও পরিবার থেকে ছিটকে পড়া কিছু শিশু সেখানে মমতার ছায়ায়, নিরাপত্তার নীড়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনে। কিন্তু প্রতিবেদন বলছে, সেই আশ্রয় যেন বঞ্চনা আর অনিয়মের কারাগার। যদি ‘অভিভাবক’-এর হাতই শিশুদের ভাগ্যকে বঞ্চিত করে তাহলে ‘মানবতা’ কোথায় লুকাবে?

এ কথা সত্য, এতিম শিশুরা কখনও উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করতে পারে না। তাদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে দেয়ালঘেরা কক্ষের ভেতরে। তাদের কান্না বাতাসে মিশে যায়, সংবাদ হয় না, বিচার পায় না। কারণ তারা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ। তাই তাদের জীবন নিয়ে খেলতে সাহস পায় অনেকেই। যেন তারা মানুষ নয়, হিসাবের খাতায় লেখা কিছু সংখ্যা মাত্র; যারা জন্ম থেকেই ভাগ্যের দ্বারা বিড়ম্বিত। কেউ হারিয়েছে মা, কেউ বাবা, আবার কেউবা দুজনকেই। যাদের দায়িত্ব তাদের মাথার ওপর সুরক্ষার ছাতা মেলে ধরার, সেই দায়িত্বপ্রাপ্তরাই আজ তাদের ব্যবহার করে ক্ষমতা, অর্থ কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অপপ্রয়াসে লিপ্ত। এটা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়Ñ এটি মানবতা হরণের সমতুল্য।

রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন, এতিম শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি শুধুই কাগজে-কলমে? সমাজ কি কেবল দান করে দায় শেষ করবে, নাকি সেই দানের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও দেখবে? কারণ এতিমের হক আত্মসাৎ করা শুধু আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়, এটি নৈতিকতার সবচেয়ে জঘন্য পতন। তাই আজ প্রয়োজন সঠিক তদন্ত, জবাবদিহিতা ও কঠোর শাস্তির। যারা এতিমদের জীবনকে ব্যবসার পণ্য বানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সব এতিমখানা ও আশ্রয়কেন্দ্রে স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা যদি শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে না পারি তা হলে সকল উন্নয়নের গল্প মিথ্যা হয়ে যাবে। কেননা, এসব এতিম আশ্রয় না পেয়ে রাস্তাঘাটে থেকে একসময় মিশে যেতে পারে সমাজের দুর্বৃত্ত-দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে।

আমরা এতিমখানাটি সরাসরি সরকারীকরণের দাবি জানাচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে এলে সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে, দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধার সহজ হবে এবং এতিম শিশুরা আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা পাবে। মনে রাখতে হবে, এতিম শিশুদের কষ্টের অশ্রু সাধারণ নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে শত শত শিশুর বঞ্চনার হাহাকার। একটি সভ্য সমাজে একদল দুর্বৃত্ত এভাবে শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে খাবে, তা বরদাস্ত করার মতো নয়। সরকার ব্ষিয়টির প্রতি দ্রুত নজর দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই। 


 সম্পাদকীয় 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা