ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১০:৩৬ এএম
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আসছে জুনে ঘোষণা হবে নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জাতীয় বাজেট। এই বাজেট এমন এক সময় ঘোষণা হতে যাচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি নানাবিধ সংকটে নিমজ্জিত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স খাত চাপের মুখে রয়েছে। বিনিয়োগেও খরা চলছে গত কয়েক বছর ধরে। এ অবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা যেকোনো সময়ের বিবেচনায় একটি রেকর্ড। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে সোয়া লাখ থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে। এরই মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ চলছে, আর ওই অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংস্কার ছাড়া বিদ্যমান কাঠামোতে কোনোভাবেই এত বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
জানা গেছে, চলতি
অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে তা
সংশোধন করে ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি
টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের চেয়ে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ
কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। এদিকে সরকারের খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এনবিআরের মাধ্যমে সরকারের
আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানামুখী সংকটের
মধ্যে আছে ব্যবসা-বাণিজ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব আদায়ে
ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। জুলাই-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক
বা ভ্যাট) ও আয়কর এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত ৯ মাসে এনবিআর
সব মিলিয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২
কোটি টাকা। তবে শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি
ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। ৯ মাসে ঘাটতি হয় সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি খাতে ২২ হাজার
৯৭৩ কোটি টাকা ঘাটতি হয়। গত জুলাই-মার্চ মাসে ভ্যাট বা মূসক আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৪ হাজার
৪০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমন ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে সোয়া লাখ কোটি
টাকা থেকে দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি
টাকা বেশি রাজস্ব আহরণ করতে হবে; যা বিদ্যমান কাঠামোতে অর্জন সম্ভব নয়।
ব্যবসা-বাণিজ্যে
শ্লথগতির কারণে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ,
কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর। জানা গেছে,
নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ আগামী ৩ মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে হবে। এপ্রিল
থেকে জুন মাসের মধ্যে আদায় করতে হবে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার
৭১২ কোটি টাকা আদায় না করলে লক্ষ্য অর্জন হবে না। এত বিপুল অর্থ আদায় করা সহজ নয়। কারণ
চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই এত রাজস্ব আদায় হয়নি। গত জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার
৩৩ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। আর এ বছরের সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায় হয়েছে আগস্ট মাসে
২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের
গতি স্বাভাবিক করা। কিন্তু নানা কারণে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ
হয়েছে। নতুন বিনিয়োগও তেমন নেই। এসব কারণে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত হারে হচ্ছে না। পুরনো
রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিশাল লক্ষ্য অর্জন কঠিন। এজন্য সংস্কার প্রয়োজনÑ এ কথা দীর্ঘদিন
ধরে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে
কম বাংলাদেশে। আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত মেগা বাজেট অর্থনীতিকে গতি দেওয়ার উচ্চাভিলাষী
উদ্যোগ হলেও এর অর্থায়ন কাঠামো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত
সংস্কার ছাড়া বড় বাজেট বাস্তবায়ন করলে ঋণ ও সুদের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে
সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে
প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা
ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
একটি দেশের অর্থনৈতিক
ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন। আর সেই অর্থের জোগান আসে কর, শুল্ক,
ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে। রাষ্ট্রের মধ্যে যখন অর্থের সংকট সৃষ্টি হয় তখন সরকার করহার
বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই চাহিদা পূরণ করে। প্রাচীনকাল থেকেই এই নিয়মে রাষ্ট্র পরিচালিত
হয়ে আসছে। আবার কর কাঠামোর ভেতরে যদি ফাঁকফোকর, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি থেকে
যায় সে ক্ষেত্রে শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয়
বৃদ্ধি পায়, পণ্যের দাম বাড়ে, জনজীবন সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি মানুষের
আস্থা কমে যায়। এ ধরনের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। কারণ
ব্যবসায়ী যখন বাড়তি কর দেন, তখন সেই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপানো হয়।
ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ সবকিছুর দাম বাড়ে। জনজীবনে মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্ন ও
মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এবং
জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনেক সময় সরকারের পক্ষে
কঠিন হয়ে পড়ে। রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে কর বাড়ানো মানে হলো দুর্নীতির পরিমাণও
বাড়ানো। কারণ করের হার যত বাড়বে, কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাও তত বাড়বে। মানুষ তখন বৈধ
পথে নয়, অবৈধ পথ খুঁজবে। ফলে কর প্রশাসনের ভেতরে ঘুষের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। এভাবে
কর বাড়ানো একধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে। সরকারের যদি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয় তবে
ট্যাক্স না বাড়িয়েও রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি ঘুষ-দুর্নীতি হ্রাস
করতে পারে তবে এমনিতেই রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়াই
পরিণত হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি বন্ধ করা গেলে দেশে রাজস্ব আয়
তিনগুণ বৃদ্ধি পেত। কর ফাঁকি ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কারণে সরকার বছরে ২,৯২,৫০০ কোটি
টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব হারাচ্ছে। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো কর ফাঁকি
ও প্রশাসনিক অনিয়ম। অতীতে বড় বড় শিল্পগ্রুপ এমপি-মন্ত্রীদের ব্যবহার করে হাজার হাজার
কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে।
অনেক সময় দেখা
যায়, নির্ধারিত করের তুলনায় কম দেখিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে
কর আদায়কারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা হয়। এতে রাষ্ট্র তার
প্রাপ্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ সমস্যা করের হারে নয়; সমস্যা কর আদায়ের প্রক্রিয়ায়।
ঘুষ একটি অদৃশ্য করের মতো কাজ করে। এটি সরকারি কোষাগারে জমা হয় না, বরং ব্যক্তিগত পকেটে
যায়। যখন একজন ব্যবসায়ী ঘুষ দিয়ে কম কর পরিশোধের সুযোগ পান, তখন রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত
হয়। আবার সৎ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তিনি নিয়ম মেনে কর দেন। কিন্তু অসৎ ব্যবসায়ী
কম খরচে ব্যবসা চালিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। এতে বাজারব্যবস্থায় অসমতা সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে
ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিচ্ছে। কর ফাঁকির মাধ্যম হিসেবে আয়
গোপন করা, ভুয়া ভ্যাট চালান ব্যবহার করা এবং সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপন করা, আন্ডার
ও ওভার ইনভয়েস, নির্ধারিত কম দামি পণ্যের আড়ালে বেশি দামি পণ্য আমদানি করে কম শুল্ক
প্রদান করা। বিগত সরকারের সময়ে কর ফাঁকিতে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদরা।
বাংলাদেশে রাজস্ব সংগ্রহে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের কর অব্যাহতি প্রদান। ব্যবসায়ীদের কর অব্যাহতি প্রদানের কারণে মানুষ ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে তার মনুষ্যত্বের গুণাবলি। সে ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারে না। প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কর্তাদের বশ করে কর-শুল্ক মাফ করে নিচ্ছে। এতে করে রাষ্ট্র রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির মতে কর ফাঁকি ছাড়াও প্রণোদনা ও কর ছাড়ের কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে। বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত যে ব্যবসায়ীরা সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য দুর্নীতি ও সরকারি নজরদারির অভাবে তারা তা পায় না। যাই হোক, আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট নানামুখী চাপের মুখেই ঘোষণা হতে যাচ্ছে। কাজেই অর্থনীতির সার্বিক বিষয় বিবেচনায় রেখেই নতুন বাজেট ঘোষণা করা বাঞ্ছনীয়।
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান, ন্যশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন