× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কয়েকটি প্রস্তাব

মতিলাল দেব রায়

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১০:৩২ এএম

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো একটি আধুনিক, কার্যকর ও সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, গ্রামাঞ্চলÑ সব জায়গায় মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্ভর করে সড়ক, রেল, নৌ ও গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দেশের যোগাযোগ খাতে এখনও বহু সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে। বিশেষ করে, রাজধানী ঢাকায় যানজট, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল গণপরিবহন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ তৈরি করছে।

ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াত করে। কিন্তু পর্যাপ্ত গণপরিবহন, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত সড়ক না থাকায় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। এতে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না, দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে প্রতিদিন কয়েক হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানির অপচয় বাড়ছে, পরিবেশ দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন শুধু উন্নয়নের অংশ নয়, এটি জাতীয় প্রয়োজন।

এ কথা সত্য যে, দেশে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশকিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোও সংস্কার ও প্রশস্ত হয়েছে। এসব উন্নয়ন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে এটা সত্য। বিশেষ করে মেট্রোরেল ঢাকার গণপরিবহনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে একটি বা দুটি প্রকল্প দিয়ে সামগ্রিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা।

তবে সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া হতাশাজনক। এখন শুধু শহরেই নয়, মফস্বল এলাকায়ও দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছেÑ তাই উপজেলাতেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য চিন্তাভাবনা করা খুব প্রয়োজন। বলা যায়, রাজধানীর বাইরের অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের অনেক আঞ্চলিক মহাসড়ক এখনও সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে গ্রামীণ সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছতে দেরি হয়, নষ্ট হয় উৎপাদিত ফসল। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করা জরুরি।

আসলে সড়কে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না তার অন্যতম কারণ হচ্ছেÑ একই রাস্তায় দ্রুততম গাড়ি, যথাÑ বাস, ট্রাক, কার এবং কম দ্রুততম যানবাহন, সিএনজি, ট্র্যাকটার তেলবাহী লরি, মোটরসাইকেল, ঠেলাগাড়িসহ স্থানীয় ছোট বড় অনেক যানবাহন। মফস্বল অঞ্চলে রয়েছে ভটভটি, নসিমন, মফিজ, চান্দের গাড়ি, টেম্পোসহ নানা প্রকার যানবাহন। প্রতিটি যানবাহনের গতি ভিন্ন ভিন্ন, তাই সব চালক এই রকম ভিন্ন গাড়ির ভিন্ন গতির সাথে সমন্বয় করে নিজের গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো। অনেক চালক অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করে গাড়ি চালান। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসচালকদের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এতে সামান্য অসতর্কতাতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। দ্বিতীয়ত, অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। দেশে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক।অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভারী যানবাহন চালান। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। তৃতীয়ত, সড়কের অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো দুর্ঘটনার বড় কারণ। দেশের অনেক মহাসড়কে খানাখন্দ, ভাঙাচুরা রাস্তা, অপর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন ও দুর্বল আলোকসজ্জা রয়েছে। কোথাও কোথাও বিপজ্জনক বাঁক বা অবৈজ্ঞানিক গতিরোধক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। চতুর্থত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলও উদ্বেগজনক। বহু পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন নিয়মিত সড়কে চলাচল করছে। ব্রেক, টায়ার কিংবা স্টিয়ারিংয়ের ত্রুটির কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু যথাযথ তদারকির অভাবে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। পঞ্চমত, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রয়োগে শিথিলতা দেখা যায়।

এছাড়া পথচারীদের অসচেতনতাও এটিও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। অনেকেই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন। মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহার না করার প্রবণতাও উদ্বেগজনক।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দক্ষ চালক তৈরি, কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, নিরাপদ সড়ক নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

রেল যোগাযোগের উন্নয়নও এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে রেলপথ তুলনামূলক নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হলেও দীর্ঘদিন অবহেলার কারণে এই খাত পিছিয়ে ছিল। কিন্তু সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে আন্তঃজেলা ও শহরতলির রেল যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। আধুনিক ট্রেন, ডাবল লাইন, উন্নত সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং সময়ানুবর্তী সেবা চালু করা গেলে মানুষ সড়কপথের পরিবর্তে রেলপথ ব্যবহারে আগ্রহী হবে।

নৌপথ বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার একটি বড় ক্ষেত্র। নদীমাতৃক এই দেশে নৌ যোগাযোগকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে সড়কপথের চাপ অনেক কমবে। কিন্তু নদী দখল, নাব্য সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে নৌপথের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নিয়মিত ড্রেজিং, আধুনিক নৌবন্দর এবং নিরাপদ যাত্রীসেবার মাধ্যমে নৌ যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সুশাসনও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় নিম্নমানের নির্মাণকাজ, দুর্নীতি ও তদারকির অভাবে সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে জনগণের অর্থ অপচয় হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া পথচারীবান্ধব নগর গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, সাইকেল লেন নির্মাণ এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা মানে শুধু গাড়ির গতি বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক চলাচল নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা টেকসই করতে হলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগে সমন্বিত উন্নয়ন ঘটাতে পারলে অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।

তাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং জনবান্ধব নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ পরিকল্পনা এবং সবার সম্মিলিত উদ্যোগ।



মতিলাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা