× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে করণীয়

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১০:২৫ এএম

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে করণীয়

ডিমেনশিয়া একটি নিউরোডিজেনারেটিভ সিনড্রোম (স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত সমস্যা), যা স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি এবং আচরণের ধীরে ধীরে অবনতির মাধ্যমে চিহ্নিত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এটি এমন একটি ক্লিনিকাল সিনড্রোম, যার মধ্যে চিন্তাশক্তির অবনতি, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদনের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া অন্তর্ভুক্ত। ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণ হলো অ্যালঝেইমার রোগ, যা প্রায় ৬০-৮০% ক্ষেত্রে দায়ী। ডিমেনশিয়া একটি বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত, কারণ এটি বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে অক্ষমতা এবং পরনির্ভরশীলতার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী এর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বয়সজনিত রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলছে। ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণত সমস্যাগুলো হলো : স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, দিকভ্রান্ত হওয়া, যোগাযোগে সমস্যা, দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা এবং মেজাজের পরিবর্তন।

২০২৪ সালের ল্যানসেট কমিশনের ১৪টি উপাদানের বর্ধিত মডেল অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৫% ডিমেনশিয়া প্রতিরোধযোগ্য বলে ধারণা করা হয়। এই মডেলে জীবনের শুরুর দিকে শিক্ষার অভাব; মধ্যবয়সে শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল, বিষণ্নতা, মস্তিষ্কে আঘাত, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ডায়াবেটিস, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতা এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বায়ুদূষণ ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ঝুঁকিগুলো যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী ডিমেনশিয়া আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই বাস করেন ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক (পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয়) অঞ্চলে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং আরও অনেক দেশে ডিমেনশিয়া রোগীর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও বার্ধক্য একটি বড় কারণ, তবে সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেমনÑ শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন), মস্তিষ্কের চর্চা এবং সামাজিক যোগাযোগ। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় যে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার (আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড) ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বলতে বোঝানো হয় এমন শিল্পজাত খাদ্যদ্রব্য, যা পরিশোধিত উপাদান, অ্যাডিটিভ (সংযোজক পদার্থ), প্রিজারভেটিভস, ইমালসিফায়ারস, রঙ এবং মিষ্টিকারক পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় এবং এতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবারের পরিমাণ খুবই কম থাকে। এই ধরনের খাবারের বৈশ্বিক বিস্তার বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো উচ্চ আয়ের দেশে মোট খাদ্য শক্তি গ্রহণের ৫০ শতাংশেরও বেশি এখন আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড থেকে আসে এবং অস্ট্রেলিয়ায় এটি প্রায় ৪২ শতাংশ। একই ধরনের প্রবণতা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের জনগণ সাধারণত পেস্ট্রি/ক্রিম রোল, চানাচুর, চিপস, আইসক্রিম, চকলেট/ললিপপ/লজেন্স, কেক, বিস্কুট, ফলের জুস, সফট ড্রিংকস, ভাজা মটরশুঁটি/ডালজাতীয় খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চাটনি, এনার্জি ড্রিংক, মিল্ক চকলেটসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিতভাবে গ্রহণ করে, যা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

যদিও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে আল্ট্রা-প্রসেসড ফুডের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান, বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড গ্রহণের সাথে ৩০টিরও বেশি ক্ষতিকর স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, মানসিক রোগ এবং অকাল মৃত্যু। সাম্প্রতিক সময়ে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের সম্ভাব্য প্রভাব মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে।

একটি নতুন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় খুব অল্প পরিমাণে আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারও ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিদিন মাত্র এক সার্ভিং আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি এবং আচরণকে প্রভাবিত করে।

গবেষকদের মতে, আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারে থাকা অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্স ফ্যাটসহ স্যাচুরেটেড ফ্যাট, অতিরিক্ত অ্যাডিটিভ, প্রিজারভেটিভ এবং কৃত্রিম উপাদান মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং স্বাভাবিক জ্ঞানীয় কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। এর প্রভাব শুধু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এসব খাবার মনোযোগ, মানসিক স্বচ্ছতা এবং দৈনন্দিন কার্যক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞগণ এখন মানুষকে আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার কমানোর এবং সম্পূর্ণ বা কম প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে যেমন তাজা ফল, শাকসবজি, শস্যজাতীয় খাবার এবং ঘরে রান্না করা খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিমেনশিয়া কেবল রোগীর জন্য নয়, বরং তার পরিবারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।


অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব

সদস্য, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা