দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে বাংলাদেশে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। বলা যায়, জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েই তারা ক্ষমতাসীন হয়েছে। ফলে এ সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। বিশেষত দুই বছরের জরুরি অবস্থার অগোছালো সরকার, পরের সাড়ে পনেরো বছরের লীগ-সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসন এবং তারপর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নিয়ন্ত্রণহীন সরকার পরিচালনা দেশবাসীকে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করেছিল। এমনই একসময়ে বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের স্টিয়ারিং হুইল এসেছে বিএনপির হাতে। দেশবাসী কোনো সরকারের কাছে ভাত-কাপড় চায় না। তারা নিজেরা উপার্জন করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। তবে সে জীবিকা নির্বাহের জন্য যে সুষ্ঠু ও সাবলীল পরিবেশ আবশ্যক, তা নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত সরকারের ওপর। সরকারের সে দায়িত্ব, যাতে সুষ্ঠুভাবে পালিত হয়, সেজন্য ভাগ করা আছে বিভিন্ন বিষয়ের মন্ত্রণালয়। আর সেসব মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে থাকেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। আর তাদের কাজের তদারকি করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ মন্ত্রীরা জবাবদিহি করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে, আর প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হয় জাতীয় সংসদ ও জনগণের কাছে। একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার জন্য জনগণ সাধারণত প্রধানমন্ত্রীকেই দায়ী করে থাকে। তাই সরকার গঠনে অর্থাৎ মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীকে অবলম্বন করতে হয় সর্বোচ্চ সতর্কতা। অনুসরণ করতে হয় ‘রাইট পারসন ইন রাইট পজিশন’ সূত্রও।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পরপরই জনমনে প্রশ্ন
উঠেছিল, ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা ৪৩ মন্ত্রণালয়
ও সেগুলোর অধীন বিভাগের কর্মযজ্ঞ দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারবে কি না। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর
উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী হিসেবেও প্রায় ডজনখানেক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারাও
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারপরও সরকার স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারছে,
দেশবাসীর তা মনে হচ্ছে না। এর অন্তর্নিহিত কারণটি উঠে এসেছে গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত ‘মন্ত্রণালয়ের চাপে পিষ্ট মন্ত্রীরা’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে,
একেকজন মন্ত্রীকে দুই-তিনটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
জীবনে কোনোদিন এমপি হননি, এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
আবার কোনো কোনোটিতে রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী সে সঙ্গে একজন উপদেষ্টাও। কৃষি, খাদ্য, মৎস্য
ও প্রাণিসম্পদ, সড়ক পরিবহন, নৌ ও রেলপথ, শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী
কল্যাণ মন্ত্রণালয় কার্যক্রম বিচারে বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ। আগে প্রায় সব সরকারের সময়
এসব মন্ত্রণালয়ে একজন করে মন্ত্রী থাকতেন। মন্ত্রণালয়ের কলেবর ও বিস্তৃতি বিবেচনায়
একজন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে।
প্রথবারের মতো এমপি হয়েছেন বা টেকনোক্র্যট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন যারা, তাদের অনেককে
দুই-তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় তারা
প্রশাসনিক কাজে তেমন দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা নির্ভর করছেন সচিবদের ওপর। ফলে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের অনেক
সিদ্ধান্তই জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। এতে বিএনপি সরকার সম্বন্ধে জনগণের মধ্যে
হতাশার জন্ম হচ্ছে; যা পরিণামে এ সরকারকে বিরূপ পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তারেক রহমান
যখন তার মন্ত্রিসভা গঠন করেন, তখন অনেকেই তাতে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা বলেছিলেন। বেগম
খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন, এমন অনেক অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের ঠাঁই দেওয়া হয়নি
মন্ত্রিসভায়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত
১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রার পরে তিনি মন্ত্রিসভার বিষয়ে নতুন চিন্তাভাবনা করবেন। তখন মন্ত্রণালয়ের
কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে ‘এক মন্ত্রী এক মন্ত্রণালয়’ নীতিগ্রহণ করে মন্ত্রিসভা নতুন
করে সাজানো হতে পারে। এটা অবশ্য আশাব্যঞ্জক খবর। তবে তা নির্ভর করছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর
ইচ্ছা ও তাকে ঘিরে থাকা উপদেষ্টাদের পরামর্শের ওপর। তিনি যদি তার মন্ত্রিসভাকে নতুন
করে ঢেলে সাজাতে পারেন এবং অভিজ্ঞদের মন্ত্রিসভা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন
করেন, তাহলে সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।