ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬ ০৯:৫৯ এএম
সাম্প্রতিক কালে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনজীবনে তার প্রভাব নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে বিশেষত, দেশের প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকাসহ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এর প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে ভেনেজুয়েলা ও ব্রাজিলে। কিন্তু সেখানকার তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার বেশি যেমন গত ১৮ মে, ২০২১ ঢাকাসহ সারা দেশে প্রবল ঝড় ও বজ্রপাতে ১৮ জন লোক মারা গেছে বিশেষত, হাওর বেষ্টিত জেলা নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ আরও এলাকায় যাদের মধ্যে অনেকেই মাঠে ধানকাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল কিন্তু এ বছর বেশ কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষণীয়, যাকে অনেকেই বলছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল এটি। তাহলে পরিবর্তনটা কী? গত ২০২২ সালে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামের মাঠের মধ্যে একটি ইঞ্জিনচালিত ঘরে বজ্রপাতে ১৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই কৃষিশ্রমিক। এদের মধ্যে দুই বোনসহ তিন কিশোরী রয়েছে। এতে আহত হয়েছে অরও পাঁচজন। গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে বরযাত্রীদের একটি দলের ওপর বজ্রপাত হলে ১৭ জন মারা যায়। বরযাত্রীরা বৃষ্টির সময় নদীতীরে অবস্থিত ইজারাদারের টিনের চালার টং ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। গত ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাতে এক দিনে এত মৃত্যু ২০১৬ সালে একবার ঘটেছিল। ওই বছর মে মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে দুই দিনে সারা দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে ৮১ জনের। বলা হয়, এ নিয়ে কারও কিছু করার নেইÑ এ হলো প্রকৃতির মার। আসলে কি তাই নাকি আমাদের কিছু করণীয় আছে। সে কথায় পরে আসছি তার আগে আরও একটা হিসাব দেখা যাক। ২০১৫ সালে বজ্রপাতে ১৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছিল। কী ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতিÑ ভাবলে গা শিউরে ওঠে। দুই দিনে তখন ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সারা দেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ২ হাজার ১৬৪ জন।
এখন কথা হলো বজ্রপাত
একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে এর ব্যাপকতা জনজীবনকে ভাবিয়ে তুলছে
এবং ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এখন তত্ত্ব-উপাত্ত সংগ্রহ কিংবা ডেটা বেইস সৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষ খুব
তৎপর। সরকারি পর্যায়ে এাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিও, গণমাধ্যম
কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যে দেখা যায় যে, বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে দুই হাজারের
বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং চার শতাধিক আহত হওয়ার খবর রয়েছে, যা গ্রামাঞ্চলে ফসলের
মাঠে, পুকুরের পাড়ে ও হাওরে বেশি সংঘটিত হচ্ছে। বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায়
২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় ও এত বেশি মৃত্যুহারের জন্য মানুষের অসচেতনাকেই দায়ী
করছেন বিশ্লেষকগণ। তারা বলেছেন, বজ্রপাত সম্পর্কে এদেশের প্রান্তিক ও নিরক্ষর জনসাধারণের
সঠিক ধারণা না থাকার দরুন মৃত্যুহার বেশি। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের সময়ও এদেশের লোকজন
খোলা মাঠে কাজ করে বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়। এর কারণ হিসেবে দেখা
দিয়েছে তাল, নারিকেল, সুপারি ও বটবৃক্ষের মতো বড় গাছের অভাব, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ধাতব
দ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি, নদনদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়া, গাছপালা ধ্বংসের
কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি বজ্রপাতের হার বাড়ার অন্যতম কারণ। আবার আবহাওয়াবিদগণ
বলছেন, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু এবং উত্তর হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের
মিলনে বজ্রমেঘ, বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায়
গড়ে ৪০টি বজ্রপাত হয়ে থাকে। এই বিষয়টি যেহেতু পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত তাই গবেষণা, গবেষক
ও জাতীয় নীতিনির্ধারণীতে তার প্রভাব নিয়ে তেমন কোনো খবরাখবর পাওয়া যায় না। এই কারণে
যে গবেষণা বিষয়টি সব সময়ই একটি অনাগ্রাধিকারের বিষয়, যা জাতীয় পরিকল্পনা কিংবা জাতীয়
বাজেটেই হোক। তারপরও পৃথিবীব্যাপী কিংবা বাংলাদেশে কিছু কিছু গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতের অবস্থান নির্ণয়ের গবেষণায় দেখা যায় যে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে
মোট বজ্রপাতের সংখ্যা ১৮০০ ছাড়িছে গেছে প্রতি বর্গকিলোমিটারে।
সামগ্রিক পরিসংখ্যান
আরও নির্মম। দেশে বছরে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। এর অর্ধেকের বেশি
হাওরাঞ্চলের বাসিন্দা। ২০১০ থেকে ২০২৪ এই ১৪ বছরে প্রায় ৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
এই সংখ্যা কোনো দুর্যোগের পরিসংখ্যান নয়Ñ এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতার হিসাব।
বৈশ্বিক গবেষণা বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্থানীয় ঘটনা নয়। নাসার জিআইএসএস-এর গবেষক
কাল প্রাইস তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন দুটি প্রকৃতিক দুর্যোগ যেমন
বজ্রপাত ও দাবানলকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে থাকে এবং পরিবেশে এখন যে পরিমাণ কার্বন
আছে তার যদি দ্বিগুণ বৃদ্ধি ঘটে তা হলে বজ্রপাত ঘটবে ৩২ ভাগ। তার মতে বায়ুদূষণের সাথে
বজ্রপাতের সম্পর্ক খুব নিবিড়। বেশিরভাগ গবেষকই মনে করেন, বাসাতে
সালফার ও নাইট্রোজেনের যৌাগগুলোর পরিমাণ, তাপ শোষণ ও সাময়িক সংরক্ষণকারী গ্যাসের
মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাত বাড়া কিংবা কমার সম্পর্ক রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী
বাঙালি গবেষক উল্লেখ করেছেন দেশের উচ্চশীল গাছপালা কিংবা বনায়ন কমে যাওয়ায় বজ্রপাত
ঘটনা ত্বরান্বিত হয়েছে। বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সরকার ২০১৬
সালে ১৭ মে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এর কারণ অনুসন্ধান কিংবা প্রতিকারের
কী উপায় হতে পারে সে বিষয় দেশের আবহাওয়াবিদরা বা দুর্যোগ বিজ্ঞানীরা সে সস্পর্কে কোনো
তথ্য-উপাত্ত দিতে পারছে না।
নাসা ও মেরিল্যান্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় পৃথিবীর তিনটি প্রধান বজ্রপাত হটস্পট চিহ্নিত হয়েছেÑ ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে
কঙ্গোর কিনশাসা, মার্চ-মেতে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ এবং জুন-নভেম্বরে ভেনেজুয়েলার লেক
মারাকাইবো। গবেষণায় বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জে তিন মাসের মৌসুমে এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে
২৫টিরও বেশি বজ্রপাত হয়। ভারতের মেঘালয় ও খাসি পাহাড় অঞ্চলে সৃষ্ট ঘন মেঘস্তর ও বায়ুমণ্ডলীয়
ঘর্ষণ থেকে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক চার্জের প্রভাব সরাসরি পড়ে হাওরাঞ্চলে। বেসরকারি সংস্থা
‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে
বজ্রাঘাতে হতাহতের প্রায় ৫২ দশমিক ৪ শতাংশই হাওর অঞ্চলের মানুষ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যুর
দায় কার? ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বীকৃতির
পর কি বদলেছে? কোথায় সেই কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, যা মাঠের কৃষককে সময়মতো জানাবে?
কোথায় পর্যাপ্ত বজ্রনিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র? কোথায় গ্রামভিত্তিক প্রশিক্ষণ? বাস্তবতা হলো,
কাগজে নীতি আছে, মাঠে সুরক্ষা নেই। প্রতিবছর একই সময়ে কৃষক যখন ঝুঁকি জেনেও হাওরে ধান
কাটতে যান, সেটি তাদের অজ্ঞতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সরাসরি ফল। কারণ তাদের সামনে
কোনো নিরাপদ বিকল্প নেই। জীবিকা আর জীবনের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করা এটি কোনো রাষ্ট্রের
দায়িত্বশীল আচরণ। আরও উদ্বেগজনক হলো সামাজিক মানসিকতা। বজ্রপাতকে এখনও অনেক জায়গায়
‘দৈব গজব’ হিসেবে দেখা হয়। এই ব্যাখ্যা শুধু বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতাই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে
আড়াল করার একটি নীরব উপায়। কারণ যখন মৃত্যু ভাগ্যের ওপর চাপানো হয়, তখন দায়িত্ব আর
কারও থাকে না।
ড. মিহির কুমার রায়
গবেষক ও অর্থনীতিবিদ