× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্বসভ্যতার নতুন মানচিত্র: আধিপত্য, প্রযুক্তি, বিপ্লব ও মানবতার ভবিষ্যৎ

কাজী জিয়া উদ্দিন

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ২২:০৮ পিএম

কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মানবসভ্যতা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পৃথিবী যেন একই সাথে একদিকে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে গভীর অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মূল্যবোধের সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে।

বিশ্বায়ন, অবাধ তথ্যপ্রবাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা ও ডিজিটাল সংস্কৃতির এই যুগে পৃথিবী আর কেবল রাষ্ট্রের সীমারেখায় আবদ্ধ নয় বরং এটি পরিণত হয়েছে প্রভাব, তথ্য, প্রযুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের এক বহুমাত্রিক রণাঙ্গনে।

একসময় সাম্রাজ্যবাদ দৃশ্যমান ছিল উপনিবেশ, সেনাবাহিনী ও পতাকার মাধ্যমে। এখন সেই আধিপত্য অদৃশ্য। বর্তমানে সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে তথ্যের স্রোত, প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক ঋণ, সাংস্কৃতিক প্রভাব ও ডিজিটাল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। আধুনিক বিশ্বের “আধিপত্য” তাই আর কেবল সামরিক শক্তির নাম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, বাজার, সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম ক্ষমতা।

স্যাটেলাইট স্টেট: স্বাধীনতার আড়ালে নির্ভরতার শৃঙ্খল

শীতল যুদ্ধের সময় “স্যাটেলাইট স্টেট” শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতো সেসব রাষ্ট্রের জন্য, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে বৃহৎ শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীন ছিল। সোভিয়েত প্রভাবাধীন পূর্ব ইউরোপ ছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

কিন্তু আজও কি পৃথিবী স্যাটেলাই স্টেটের বাস্তবতা থেকে মুক্ত? প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখন হয়তো ট্যাংক পাঠিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয় না; বরং ঋণনীতি, সামরিক জোট, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, সাইবার অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্র নীরবে বৃহৎ শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এ যেন স্বাধীনতার নতুন সংস্করণ- যেখানে পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে, কিন্তু নীতিনির্ধারণের অনেক সুতো অদৃশ্য শক্তির হাতে বাঁধা।

গ্লাসনস্ট ও পেরেস্ত্রোইকা: এক সাম্রাজ্যের আত্মসমালোচনা

মিখাইল গরবাচেভ ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভয়, গোপনীয়তা ও দমননীতি দিয়ে একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। তাই তিনি “গ্লাসনস্ট” এবং “পেরেস্ত্রোইকা”-এর মাধ্যমে সোভিয়েত ব্যবস্থাকে সংস্কারের চেষ্টা করেন।

গ্লাসনস্ট মানুষকে কথা বলার সাহস দিয়েছিল; পেরেস্ত্রোইকা অর্থনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো যে সংস্কার সোভিয়েত ব্যবস্থাকে বাঁচানোর জন্য শুরু হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পথকে ত্বরান্বিত করে।

তবু এই দুই ধারণা মানবসভ্যতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—স্বচ্ছতা ছাড়া রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না, এবং জনগণের কণ্ঠরোধ করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না।

আজকের ডিজিটাল যুগে গ্লাসনস্ট নতুন অর্থে ফিরে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক সাংবাদিকতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভ্রান্ত তথ্য, প্রচারণা ও অ্যালগরিদমিক প্রভাব-নিয়ন্ত্রণ নতুন ধরনের বিপদও সৃষ্টি করছে। ফলে তথ্যের স্বাধীনতা এখন যেমন আশীর্বাদ, তেমনি তা এক ভয়ংকর অস্ত্রও।

ভেলভেট রেভ্যুলুশান: রক্তপাতহীন পরিবর্তনের সৌন্দর্য

ভেলভেট রেভ্যুলুশান মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনা। এটা দেখিয়েছিল যে বিপ্লব সবসময় রক্তে রঞ্জিত হতে হয় না; মানুষের ঐক্য, সংস্কৃতি, বিবেক ও নৈতিক শক্তিও স্বৈরতন্ত্রকে পরাজিত করতে পারে।

চেকোস্লোভাকিয়ার মানুষ গান, কবিতা, মোমবাতি ও প্রতিবাদের ভাষায় একটি ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছিল। মখমলি বিভেলভেট রেভ্যুলুশান ছিল সভ্যতার প্রতি মানুষের আস্থার প্রতীক, যেখানে বন্দুকের চেয়ে বিবেক শক্তিশালী হয়েছিল।

আজকের পৃথিবীতে যখন সহিংসতা ও মেরুকরণ ক্রমশ বাড়ছে, মখমলি বিপ্লব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সভ্যতার প্রকৃত শক্তি ধ্বংসে নয়, রূপান্তরে।

আরব জাগরণ: স্বপ্ন, বিদ্রোহ ও বাস্তবতার সংঘর্ষ

আরব জাগরণ ছিল ডিজিটাল যুগের প্রথম বৃহৎ গণঅভ্যুত্থান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তখন মানুষের হাতে এক নতুন শক্তি তুলে দিয়েছিল। দীর্ঘদিনের দমন, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল স্বাধীনতা ও মর্যাদার স্বপ্ন নিয়ে।

কিন্তু আরব জাগরণ এক জটিল বাস্তবতারও প্রতীক। কোথাও শাসক পতন ঘটেছে, কোথাও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, কোথাও আবার নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদ ফিরে এসেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে বিপ্লব শুরু করা সহজ, কিন্তু স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।

তবু আরব জাগরণ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখিয়েছে, মানুষের ভেতরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয় না।

নর্ডিক মডেল বনাম প্রযুক্তিগত আধিপত্য

সুইডেন, নরওয়ে কিংবা ফিনল্যান্ড দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র চাইলে প্রযুক্তি ও মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। সেখানে উন্নয়ন কেবল মোট দেশজ উৎপাদন নয় বরং মানুষের মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি কর্পোরেশনগুলো এক নতুন “প্রযুক্তিগত আধিপত্য” তৈরি করছে। তারা কোটি কোটি মানুষের তথ্য, আচরণ, পছন্দ ও মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে ক্ষমতা কি নির্বাচিত সরকারের হাতে থাকবে, নাকি অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট শক্তির হাতে?

মনরো নীতি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি

জেমস মনরোর মনরো নীতি কিংবা ডুয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের আইজেনহাওয়ার নীতি ছিল ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে নতুন নীতি তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে।

এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে-

  • কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব দেবে 
  • কে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে 
  • কে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে এগিয়ে থাকবে 
  • কে মহাকাশ প্রযুক্তির আধিপত্য পাবে 
  • কে বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণ করবে 

ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো আর কেবল সীমান্তে হবে না; হবে তথ্যকেন্দ্র, উপগ্রহ নেটওয়ার্ক, সাইবার জগৎ ও মানুষের উপলব্ধির ভেতরে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শিক্ষা: মানুষ কি আবার ভুল পুনরাবৃত্তি করছে?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে শিখিয়েছিল যে উগ্র জাতীয়তাবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও জোট রাজনীতি সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু আজও পৃথিবী আবার মেরূকরণের দিকে এগোচ্ছে। নতুন শীতল যুদ্ধের আভাস, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত বিভাজন ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা মানবসভ্যতাকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পার্থক্য শুধু এতটুকু- আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধের পাশাপাশি তথ্যও অস্ত্র।

উপসংহার: ভবিষ্যতের পৃথিবী কোন পথে

মানবসভ্যতা এখন দুটি বিপরীত সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

একদিকে এমন একটি পৃথিবী, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও বৈশ্বিক সহযোগিতা মানুষের জীবনকে আরও উন্নত, মানবিক ও সৃজনশীল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে এমন এক পৃথিবীও সম্ভব, যেখানে নজরদারি-নির্ভর পুঁজিবাদ, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ, ভ্রান্ত তথ্য ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও মানবিক সত্তাকে সংকুচিত করে ফেলবে।

গ্লাসনস্ট আমাদের স্বচ্ছতার শিক্ষা দেয়।

পেরেস্ত্রোইকা শেখায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা।

ভেলভেট রেভ্যুলুশন দেখায় শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের শক্তি।

আরব জাগরণ মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনও মরে না।

নর্ডিক মডেল শেখায় মানবিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য।

আর প্রযুক্তির বর্তমান বিস্ফোরণ মানবসভ্যতাকে প্রশ্ন করে- মানুষ কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষকে পরিচালিত করবে?

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের ওপর- সভ্যতা কি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় এগোবে, নাকি মানবিক প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ ও সহাবস্থানের নতুন দর্শন নির্মাণ করবে?

কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে- যে সভ্যতা প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানবিকতায় দেউলিয়া হয়ে পড়ে, তার পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা।


কাজী জিয়া উদ্দিন
অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা